নতুন যুগের সূচনা: সংসদে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
দীর্ঘ দেড় যুগের অঘোষিত স্বৈরশাসন ও জনবিচ্ছিন্ন শাসনব্যবস্থার পর বাংলাদেশে সরাসরি ভোটে একটি সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে দেশ। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় দেড় বছর রাজনৈতিক সরকারবিহীন সময় পার করে এখন ব্যালটের মাধ্যমে জনতা তাদের রায় দিয়েছে। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত হচ্ছেন।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বর্তমানের উদ্বেগ
বিগত প্রায় আঠারো বছরে দেশের শাসনব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে সংসদ কেবল ক্ষমতার বৈধতা দেওয়ার যান্ত্রিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছিল। জনপ্রতিনিধিরা সেখানে জনগণের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার পরিবর্তে চাটুকারিতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত ছিলেন। মানুষের মৌলিক অধিকার, জীবনযাত্রার মান বা কৃষক-শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়ে জোরালো আলোচনা সেখানে অনুপস্থিত ছিল।
একশ্রেণির সংসদ সদস্য ব্যস্ত ছিলেন জনগণের সম্পদ লুটে নিতে এবং ক্ষমতার কাছাকাছি গোষ্ঠীর তোষণে। আদালতের ক্ষমতা খর্ব করা থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে একের পর এক পরিবেশ ও প্রকৃতিবিধ্বংসী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজপথের সংঘাত ও জনগণের মূল্য
সংসদ যখন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন জনতা অনিবার্যভাবে রাজপথে নেমে আসে। গত আঠারো বছরে আমরা নিয়মিতভাবে এই চিত্র প্রত্যক্ষ করেছি। জনদাবি আদায়ের কোনো কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হয়েছে।
- পুলিশি লাঠিপেটা ও জলকামানের পাশাপাশি বানোয়াট মামলার যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।
- রাজপথে নামা মানেই ব্যক্তিগত জীবনে দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হওয়া।
- দীর্ঘ সড়ক অবরোধের কারণে শহরজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে এবং অজস্র কর্মঘণ্টা অপচয় হয়েছে।
- রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকার মর্মান্তিক দৃশ্যও বহুবার দেখা গেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাব আমরা এখনো বহন করছি এবং ভবিষ্যতেও করব বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন সম্ভাবনা ও সংসদের ভূমিকা
এখন আমাদের সামনে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এবং একটি বিরোধী দল তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে সংসদই সব বিতর্কের কেন্দ্রস্থল হওয়া উচিত, যেখানে আলোচনার মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসবে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব হবে জনদাবিগুলো নিয়মিতভাবে সংসদে তোলা। জনগণের কষ্টের কথা সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া বিরোধী দলের দায়িত্ব, আর তা যৌক্তিকভাবে সমাধান করা সরকারের কর্তব্য। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশে অনেকটাই বিস্মৃত ছিল, তাই জনগণের আশা, এবার সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল সমানভাবে দায়িত্বশীল হবে।
সহিংসতা রোধ ও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা
ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর কিছু জায়গায় যে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা গণতন্ত্রের পথে প্রথম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু বিজয়ীদের বিনয় এবং পরাজিতদের ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। যাঁরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন, তাঁরা মূলত দেশের আইন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকেই অস্বীকার করছেন।
নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রকাশের সুযোগ পায়নি এবং নানা নাগরিক কষ্টে জীবন কাটিয়েছে, তাই এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট ও রাজনৈতিক সংঘাত কমানোর দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের ওপর বর্তায়।
সংসদীয় সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
রাজপথকে বিশ্রাম দেওয়া মানে রাজনৈতিক অনুপস্থিতি নয়, বরং এর অর্থবহ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রতিবাদ বা সংহতির জন্য সব সময় রাস্তা অবরোধ করতেই হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর সমাধান আসতে হবে সংসদ থেকেই। যখন একজন নাগরিক জানবেন যে সংসদে তাঁর হয়ে জনপ্রতিনিধি কথা বলছেন, তখন মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
- বিচার বিভাগের সংস্কার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে সংসদে উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন।
- বিগত সরকারের সময়ে প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি যে অবহেলা দেখা গেছে, তার বিরুদ্ধে সংসদকে সোচ্চার হতে হবে।
- সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করা জরুরি, যাতে জনগণের প্রতিটি টাকার হিসাব যথাযথভাবে তদারক করা যায়।
রাজনীতির চর্চা যখন প্রাসাদ বা রাজপথে নয়, বরং সংবিধানসম্মত নির্ধারিত কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে, তখনই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরে আসবে। এটি টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শেষ কথা: জনগণের প্রত্যাশা ও দায়িত্ব
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সার্থকতা নির্ভর করছে একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ সরকার গঠনের ওপর। জনগণ এবার কেবল নির্বাচন চায়নি, তারা চেয়েছে ক্ষমতায় প্রকৃত অংশীদারত্ব। সংসদের ভেতরে ও বাইরে জনমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হবে নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রকৃত পরীক্ষা।
ক্ষমতাসীন দল যেন অহংকার পরিহার করে সর্বস্তরের মানুষকে আলিঙ্গন করে নেয়, আর বিরোধী দল যেন হীনস্বার্থে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতিতে ফিরে না যায়। আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনীতির নামে সহিংসতা আবার রাজপথে ফিরে আসবে, যা কারও কাম্য নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হচ্ছে, তা যেন সত্যিকারের কল্যাণমুখী ও অহিংস পথনির্দেশক হয়। রাজপথ ফিরে পাক তার স্বাভাবিকতা, আর সব মতপার্থক্যের সমাধান হোক জাতীয় সংসদে।
