নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা: জামায়াতের অভিযোগ ও বাস্তবতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্ররা আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ভোটে জয়ী বিএনপির নেতা–কর্মীরা এই হামলা চালাচ্ছেন বলে দলটির দাবি। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে, তাদের মিত্ররা জিতেছে আরও ৯টি আসনে।
ফেসবুক পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগ
গতকাল শনিবার জামায়াতের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ভোট গ্রহণের পর ১৬ জেলার ২১টি স্থানে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তোলা হয়। এই হামলায় অনেকে আহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট হয় বলে দাবি করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে এই অভিযোগের অনেকটির সত্যতা পাওয়া গেছে, তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে সত্যতা মেলেনি। দু-একটি ক্ষেত্রে জামায়াতের স্থানীয় নেতারাও হামলার খবর জানেন না বলে জানিয়েছেন।
খুলনায় ঘটনার বিবরণ
জামায়াতে ইসলামীর দাবি অনুযায়ী, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্যের (ভিসি) ওপর ছাত্রদল কর্মীরা হামলা চালান। খবর নিয়ে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে কুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালীকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন একদল শিক্ষার্থী। তাঁর বাসভবনের ফটকে তালা দেওয়ার চেষ্টাও হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে একটি ব্যানার টাঙানো হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’। ক্যাম্পাসের একাধিক সূত্র জানায়, কুয়েটে ছাত্রদলের কোনো কমিটি নেই, তবে ছাত্রদল বা বিএনপির সমর্থক শিক্ষার্থীরা ব্যানার টাঙানোর কাজটি করেন।
অন্যান্য জেলার ঘটনাপ্রবাহ
গোপালগঞ্জে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয় ফেসবুক পোস্টে। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা গোপালগঞ্জের ঘটেনি, এটা ফেসবুকে গুজব ছড়িয়েছে। পঞ্চগড়ে বিএনপির কর্মীদের হাতে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর এবং অনেক আহত হওয়ার অভিযোগ এসেছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে এ ধরনের ‘ছোট ছোট’ ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হচ্ছে।
দিনাজপুর ও কুড়িগ্রামের ঘটনা
দিনাজপুরে জামায়াতের পোলিং এজেন্ট হওয়ায় ছেলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়ার একটি অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনাটি দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার। কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখমের অভিযোগ করা হয়েছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট থানার ওসি আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ঘটনাটি ভোটসংক্রান্ত নয়, বরং জমিতে পানি দেওয়া নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে সংঘর্ষ হয়েছে।
বগুড়া, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীর প্রতিক্রিয়া
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় শিবিরের কর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহরে জামায়াত নেতার ওপর শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ করা হয় ফেসবুক পোস্টে। তবে দিরাই উপজেলা জামায়াতের প্রচার বিভাগের সম্পাদক এমরান হোসাইন বলেন, দিরাই পৌর শহরে নির্বাচনের পর কোনো জামায়াত নেতা আক্রমণে শিকার হয়েছেন বলে তাঁর জানা নেই। নোয়াখালীর সেনবাগে জামায়াত নেতার ওপর ছাত্রদল কর্মীদের অতর্কিত হামলা হয় বলে অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। প্রথম আলোর প্রতিনিধি জানান, সেনবাগ উপজেলার অন্তত তিনটি স্থানে জামায়াতের কর্মীদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অবস্থা
ফেনীর ফুলগাজীতে ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার দোকানে হামলা এবং মুন্সীরহাটে জামায়াতের কর্মীদের চারটি দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জামায়াতের কর্মীর বাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। বলা হচ্ছে, যাঁদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, তাঁরা ভোটের দিন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করেছিলেন। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় জামায়াতের নেতার বাড়িতে বিএনপির কর্মীরা দফায় দফায় হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে।
বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জের প্রতিবেদন
বাগেরহাট-৪ আসনে আল-আমিন নামের এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে বলে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়। কুষ্টিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। তবে কুষ্টিয়ায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী কে এম আর শাহিন। সিরাজগঞ্জে জামায়াতের জেলা আমিরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে দলটির ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়। জেলা জামায়াতের আমির হারুন অর রশিদ বলেন, প্রতিপক্ষের লোকজন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য এমন আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।
বরিশাল ও সামগ্রিক মূল্যায়ন
বরিশালে বাবার রাজনৈতিক (জামায়াত) পরিচয়ের জেরে ছেলের গাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে, তবে খোঁজ নিয়ে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সামগ্রিকভাবে, জামায়াতের অভিযোগের অনেকটিই স্থানীয়ভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে গুজব বা ভিন্ন ঘটনার মিশ্রণ লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী এই সহিংসতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
