সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান
সাধারণত বঙ্গভবনের দরবার হলে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও এবার এর ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। আগামী মঙ্গলবার বিকেলে এই শপথ অনুষ্ঠান হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বিএনপির সূত্রে জানা গেছে।
শপথ অনুষ্ঠানের সময়সূচি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। আর বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ হবে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। সংবিধান অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট
জাতীয় সংসদ হলো গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। দেড় বছর ধরে জাতীয় সংসদ না থাকলেও সংসদ ভবনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিসভার শপথও সেখানে হচ্ছে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রস্তুতি
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন শুক্রবার রাতে নির্বাচনে বিজয়ী ব্যক্তিদের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। সাধারণত জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে এ শপথ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, আপাতত ১৭ তারিখ শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক বক্তব্য
অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের আগে গতকাল দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, নতুন মন্ত্রিসভার শপথ হতে পারে সর্বোচ্চ আগামী তিন–চার দিনের মধ্যে। এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছিলেন, বঙ্গভবনে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ শপথ পড়াবেন। তবে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বঙ্গভবন নয়, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হবে মন্ত্রিসভার শপথ।
গত দেড় বছরের সংসদ ভবনের কার্যক্রম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরদিন ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি। এর পর থেকে সংসদ না থাকলেও সংসদ ভবনকে কেন্দ্র করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের কার্যালয় করেছিল সংসদ ভবন এলাকায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কার্যালয় সেখানে করা হয়েছিল।
এরপর নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কার্যালয়ও স্থানান্তর করা হয় সংসদ ভবন এলাকায়। সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিশনের কার্যালয়ও ছিল এই এলাকায়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ওই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়।
নির্বাচন ফলাফল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন
প্রসঙ্গত, দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দুই দশক পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হয়। ইতিমধ্যে ২৯৭ আসনে বিজয়ীদের গেজেট জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় দুটি আসনের ফলাফলের গেজেট জারি করা হয়নি।
নির্বাচনে ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পেয়েছে। ফলাফল ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। তাঁদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন।
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।
