বিএনপির নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ: আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও কূটনীতি
বিএনপির নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ: আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি

বিএনপির নতুন সরকার গঠন: চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পরিচালনায় তারেক রহমানকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

নতুন সরকারের সামনে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থবির অর্থনীতি সচল করা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ভারতসহ বহির্বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বিদেশে সংকুচিত শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক অস্থিরতা দূর করা এবং সর্বসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশে উগ্র মতাদর্শের শক্তির উত্থানও নতুন সরকারের জন্য একটি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন

গত ১৮ মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ, ‘মব’ সহিংসতা, দখল ও অবরোধ—এসব ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, রাস্তা অবরোধ ও সহিংসতার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও জনআস্থা পুনর্গঠন করা।

স্থবির অর্থনীতি সচল করা

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত দেড় বছরে নানা অনিশ্চয়তা, মামলা ও ব্যাংক হিসাব জব্দের কারণে বিনিয়োগ কমেছে। যন্ত্রপাতি আমদানি ২০-২৫ শতাংশ কমেছে, নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রফতানিতে গতি ফেরানো জরুরি।

প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে রাজনৈতিক বিভাজন, বাধ্যতামূলক অবসর, পদোন্নতি বিতর্ক ও পদায়ন নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সচিবালয়সহ বিভিন্ন দফতরে কর্মবিরতি ও অবরোধের ঘটনাও ঘটে। দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

ভারতসহ বৈশ্বিক কূটনীতি পুনর্গঠন

প্রতিবেশী ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশ্লেষকেরা। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের কথা আলোচনায় আসে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক পরে ১৯ শতাংশে নামানো হলেও বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা জরুরি। চীন-ভারত-পাকিস্তানসহ সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গঠন বড় চ্যালেঞ্জ।

শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার

বিভিন্ন দেশে ভিসা জটিলতা ও বিধিনিষেধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি কমেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রবাসী আয় স্থিতিশীল রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি

কারখানা বন্ধ ও বিনিয়োগ হ্রাসের ফলে বেকারত্ব বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।

বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি

নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃত্রিম সংকট, মজুত ও বাজার অস্থিরতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৩-৪ শতাংশে নামানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য। বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি।

ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান সামাল দেওয়া

সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। দলটির নীতি ও বক্তব্য নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

জননিরাপত্তা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা

নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ, দখল ও হামলার ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।

বিশেষজ্ঞদের মত

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সুশাসন, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা ও শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া টেকসই সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক ও খনিজ খাত প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করছে না। অন্যদিকে, জুলাই মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ শতাংশ কমেছে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক ধীরগতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।

তিনি জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বৃদ্ধি করেছে। আগের বছরের তুলনায় এলএনজি আমদানি বেড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ আমদানিও ১৩ শতাংশ বাড়াতে হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সুষ্ঠ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি অপরিহার্য বলেও মনে করেন তিনি।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়ার ভাষ্য, দলবাজিমুক্ত দক্ষ প্রশাসন ছাড়া কার্যকর সরকার পরিচালনা কঠিন।

সব মিলিয়ে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও নতুন সরকারের সামনে নীতি, দক্ষতা ও আস্থার সমন্বয়ে কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।