দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের ভূমিকা

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

নিম্নকক্ষ: সরাসরি জনগণের প্রতিনিধিত্ব

নিম্নকক্ষ বা ‘জাতীয় সংসদ’ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে। এটি রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। দেশের বাজেট এবং অর্থ সংক্রান্ত সব বিল পাশের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিম্নকক্ষের হাতেই থাকবে। তবে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল পাশের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

নিম্নকক্ষে নির্বাচিত ৩০০ জনের সঙ্গে সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন নারী সদস্য যুক্ত হবেন। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উচ্চকক্ষ: দ্বিতীয় চিন্তার সুযোগ

উচ্চকক্ষ গঠিত হবে প্রথম সংসদ অধিবেশন হওয়ার ২১০ দিনের মধ্যে। প্রথম ১৮০ দিন নিম্নকক্ষের সদস্যরা সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবেন। পরের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।

উচ্চকক্ষে মোট সদস্য হবেন ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) সদস্য মনোনীত হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দল যদি ৪০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা ৪০টি আসন পাবে। আবার কেউ ১ শতাংশ ভোট পেলে তাদের ১ জন প্রতিনিধি থাকবে উচ্চকক্ষে।

উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর নির্ভর করবে। সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।

সংসদের কাজ ও কার্যক্রম

বাংলাদেশের সংসদ মূলত আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ সভা। এখান থেকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন পাশ হয়ে থাকে। সংসদে একজন স্পিকার ও এক বা একাধিক ডেপুটি স্পিকার থাকেন, যারা সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করেন। সংসদের একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

সংসদে মূলত আইন প্রণয়ন প্রস্তাব বিল আকারে হয়। এটি প্রথমে সংসদে প্রস্তাব করা হয়। পরে বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য ভোট হয়। এছাড়া কোনো প্রকার কর আরোপ বা অর্থ ব্যয় করতে হলে সংসদের অনুমোদন লাগে। তবে সাংবিধানিকভাবে সংসদ পাস করা সব আইনের ওপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন।

একটি বৈধ অধিবেশন চালানোর জন্য কোরাম (কথোপকথনে সভায় উপস্থিতি) প্রয়োজন, সাধারণত সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম সংখ্যা উপস্থিত থাকতে হয়। উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষ সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট এবং উচ্চকক্ষের মেজরিটির ভোট লাগবে।

চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

বিশ্লেষকরা এ ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও তুলে ধরেছেন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের জন্য নতুন ভবন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ১০৫ জন নতুন সদস্যের বেতন-ভাতা বাবদ রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। দুই কক্ষের পর্যালোচনার কারণে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আইন পাশ করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

উচ্চকক্ষ বা সিনেট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত বা দলের অনুগত ব্যক্তিদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। এটি একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ

সংস্কার কমিশনের মতে, এ ব্যবস্থা জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং কোনো একক দলের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ বন্ধ করবে। উভয় কক্ষের মেয়াদকাল হবে চার বছর। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণের রায় পেলে এ রূপরেখাটি চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।

কমিশন মনে করছে, এটি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন আনবে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।