রাজধানীতে ১৫ মাসে ৪৭৯ হত্যা, ১৯৩টি রাজনৈতিক কারণে
রাজধানীতে ১৫ মাসে ৪৭৯ হত্যা, ১৯৩টি রাজনৈতিক

রাজধানীতে গত ১৫ মাসে সংঘটিত ৪৭৯টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৯৩টি বা প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এই তথ্য প্রকাশ করেছে। সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে ডিএমপির ওয়ারী, গুলশান ও উত্তরা বিভাগে।

রাজনৈতিক হত্যার উদাহরণ

গত ৭ জানুয়ারি রাতে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে মোটরসাইকেল আরোহী কয়েকজন যুবকের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এটি রাজনৈতিক কোন্দলের ফল। এর আগে গত বছরের ২৫ মে রাতে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় চায়ের দোকানে বসে থাকা বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে মুখোশধারী দুই ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনার পেছনেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতামত

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বড় ভূমিকা পালন করে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও এলাকার প্রভাব ধরে রাখতে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে গেলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিরতা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই বড় কারণ। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করতেও এ ধরনের সংঘাত হয়। কোনো কোনো গোষ্ঠী পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে বা নির্বাচন বানচালের জন্য পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ঘটায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় হত্যাকাণ্ডের সঠিক কূলকিনারা করতে না পারলে পুলিশ সেটিকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ বলে চালিয়ে দেয়, যা পুলিশের ওপর চাপ কমায়। সাধারণ মানুষ মনে করে এটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, তাই তারা উচ্চবাচ্য করে না। সাগর-রুনী হত্যা মামলার মতো বড় মামলার তদন্তে ধীরগতি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ইঙ্গিত করে।

পরিসংখ্যান

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ৪৭৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ওয়ারী বিভাগে ১১০টি, মিরপুর বিভাগে ৮০টি, তেজগাঁও বিভাগে ৬১টি, গুলশান বিভাগে ৫৬টি, উত্তরা বিভাগে ৫৪টি, মতিঝিলে ৪৮টি, লালবাগে ৪২টি ও রমনায় ২৮টি হত্যা হয়। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি ৭৫টি হত্যা ঘটে, জুনে ৪৯টি ও ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি।

মোট ৪৭৯ হত্যার মধ্যে রাজনৈতিক কারণে ১৯৩টি, যা ৪০.২৯ শতাংশ। রাজনৈতিক কারণে সবচেয়ে বেশি হত্যা হয় ওয়ারী বিভাগে ৫৮টি, যা মোট রাজনৈতিক হত্যার ৩০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে গুলশান বিভাগে ২৮টি (১৫ শতাংশ) ও উত্তরা বিভাগে ২৬টি।

পুলিশের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক কারণে হত্যা ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ধরনের হত্যা ঠেকাতে রাজনৈতিক ব্যক্তি, সামাজিক নেতা ও ধর্মীয় বক্তাদের সবার অবদান রাখতে হবে।

পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, অপরাধ দমনের একটি উপায় হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আগাম তথ্য না থাকলে এই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ কম। তবে কেউ জিডি করলে বা বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করলে পুলিশ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। অপরাধ ঘটার পর দ্রুত আসামি গ্রেফতার ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এলাকায় পুলিশের দৃশ্যমানতা ও টহল বাড়াতে হবে এবং বিট পুলিশিং ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে।

রাজনৈতিক হত্যা কমাতে রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয় সম্পর্কে আব্দুল কাইয়ুম বলেন, দলগুলোর একটি শক্তিশালী মনিটরিং সিস্টেম থাকা উচিত। দলের অভ্যন্তরে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকতে হবে।