চট্টগ্রামে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: কিরিচ ও লাঠি হাতে দুই নেতা শনাক্ত
চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্র ও লাঠি হাতে থাকা দুই ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা পুলিশ ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, কিরিচ হাতে থাকা ব্যক্তি ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুক। অন্যদিকে লাঠি হাতে থাকা ব্যক্তি রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইন, যিনি জামায়াত সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
সংঘর্ষের পটভূমি ও আহতের সংখ্যা
গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই দফায় সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখাকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্থানীয় শাখার সভাপতি আশরাফুল ইসলামের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বুধবার ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
ছাত্রদল ও শিবিরের বক্তব্য
নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম দাবি করেছেন, “ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ছেলেদের ওপর হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে আমাদের কর্মীরা পাথর নিক্ষেপ করে। শিবিরের কর্মীরা কিছু কিরিচ ফেলে যায়। সেগুলো সরানোর জন্য হয়তো মির্জা ফারুক হাতে নিয়েছিল। তখন সাংবাদিকেরা ছবি তুলে ফেলেন।” অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ও ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সাদিক কায়েম ছাত্রদলকে দায়ী করে বলেছেন, “এটা তো পরিষ্কার, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এ হামলার সঙ্গে জড়িত।”
পুলিশের তদন্ত ও ব্যবস্থা
নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, অস্ত্রধারী ও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ফুটেজ ও ছবি বিশ্লেষণ করে অভিযান চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ মামলা না করায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া রোধে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বণিক সমিতির প্রতিক্রিয়া
তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, “ছাত্রদের ঘটনার সময় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মী সেখানে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকর। এ বিষয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইনের ফেসবুক প্রোফাইল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তিনি বিভিন্ন সময় জামায়াতের কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৫৪ সালে ‘চট্টগ্রাম নাইট কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাসটি রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। গতকাল ছাত্রদল নিউমার্কেট মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে, যেখানে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেছেন, “চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চলতে দেওয়া হবে না।”
এই ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত আটজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে অস্ত্রধারী অন্যান্য ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যা শিক্ষাঙ্গনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।



