সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি চাওয়া নিয়ে সমালোচনা, টিআইবির প্রশ্ন
হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি চাওয়া নিয়ে সমালোচনা, টিআইবির প্রশ্ন

সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি চাওয়া নিয়ে সমালোচনার ঝড়

জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ গাড়ির ব্যবস্থা করার দাবি তুলে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। যদিও সংসদ সদস্যরা প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পান, তবুও হাসনাত আবদুল্লাহ এই দাবি জানান। গত মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে তাঁর এই বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সমর্থন জানিয়ে বলেন, ছোটদের আবদারে সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়।

গাড়ি চাওয়ার পেছনের কারণ ও সমালোচনা

হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি চাওয়া এবং শফিকুর রহমানের সমর্থনের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, সংসদ সদস্যরা বড় অঙ্কের যাতায়াত ভাতা পাওয়ার পরও কেন গাড়ি চাইছেন। উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ২০২৫ সালের নভেম্বরে সিলেটে একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আগামীতে যদি তাঁদের দলের কেউ এমপি হন, তাহলে তারা সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না।

এ প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ বুধবার সংসদে একটি ব্যাখ্যা দেন। তিনি অভিযোগ করেন যে গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি চাননি, বরং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ডসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের মতো একই প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের গাড়ি দেওয়ার কথা বলেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টিআইবির তীব্র প্রতিক্রিয়া

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই দাবির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের জন্য মাসিক ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা রয়েছে। এরপরও গাড়ি চাওয়ার সুযোগ নেই। শুল্কমুক্ত গাড়ির বিষয়টি যেহেতু প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, ফলে গাড়ি চাওয়াটা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের মতো যদি গাড়ি চাওয়া হয়, তাহলে বলতে হয় নিজেদের সুবিধা বিবেচনায় সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তার পার্থক্য তাঁরা বুঝতে চাইছেন না।’

বসার কক্ষ নিয়েও বিতর্ক

গাড়ির দাবির পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। গত ৩১ মার্চ এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা করার দাবি জানান। এরপর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় প্রতিটি উপজেলা পরিষদের দোতলায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, এই ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে এবং সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘এটা স্থানীয় সরকারের ভূমিকাকে খর্ব করার শামিল। ক্ষমতা খর্ব করার পাশাপাশি এটি স্থানীয় সরকারের বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করবে।’

সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা

গাড়ি চাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্যের মাসিক পারিশ্রমিক ৫৫ হাজার টাকা। এছাড়া তারা নিম্নলিখিত ভাতা পান:

  • মাসিক যাতায়াত ভাতা: ৭০ হাজার টাকা
  • নির্বাচনী এলাকা ভাতা: সাড়ে ১২ হাজার টাকা
  • আপ্যায়ন ভাতা: ৫ হাজার টাকা
  • টেলিফোন ভাতা: ৭ হাজার ৮০০ টাকা
  • ধোলাই ভাতা: দেড় হাজার টাকা
  • চিকিৎসা ভাতা: ৭০০ টাকা

এই ভাতাগুলো আয়করমুক্ত। নির্বাচনী এলাকায় অফিস রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে তারা ১৫ হাজার টাকা এবং থালাবাসন, টয়লেট্রিজ ও অন্যান্য পণ্য কেনার জন্য ৬ হাজার টাকা পান। সংসদ অধিবেশন ও কমিটির বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য তারা পরিবহন ভাতাও পান।

এছাড়া, সংসদ সদস্যরা পাঁচ বছরে একটি কর ও শুল্কমুক্ত গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন। বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ভ্রমণ ভাতা এবং ১০ লাখ টাকার বিমাসুবিধাও তাদের প্রাপ্য।

এই সুযোগ-সুবিধাগুলো সত্ত্বেও গাড়ি চাওয়ার দাবি নৈতিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।