সংসদে এস আলম গ্রুপের ঋণ পুনরুদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন, অর্থমন্ত্রীর জবাবে সমঝোতা অস্বীকার
এস আলম গ্রুপের ঋণ পুনরুদ্ধার নিয়ে সংসদে প্রশ্নোত্তর

সংসদে এস আলম গ্রুপের ঋণ পুনরুদ্ধার নিয়ে তীব্র প্রশ্নোত্তর

জাতীয় সংসদে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সরকারের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না—এমন তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সরাসরি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে সমঝোতার সম্ভাবনা অস্বীকার করে বলেন, বিএনপির রাজনীতিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে কারও সঙ্গে কোনো সমঝোতা করার সুযোগ নেই

হাসনাত আবদুল্লাহর উত্থাপিত প্রধান প্রশ্নসমূহ

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের মোট ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে এস আলম গ্রুপ একাই ৮০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া জনতা ব্যাংক থেকে এই গ্রুপ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখনো খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

তিনি সরাসরি অর্থমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন:

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • এস আলম গ্রুপের ঋণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এই অর্থবছরে সরকারের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
  • এই ঋণ পরিশোধ না করে কীভাবে এস আলম গ্রুপকে নতুন করে পুনর্বহাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে?
  • এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না?

অর্থমন্ত্রীর বিস্তারিত ও দৃঢ় জবাব

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার জবাবে প্রথমেই সমঝোতার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, বিএনপি যতবারই সরকারে এসেছে, ফাইন্যান্সিয়াল ডিসিপ্লিন নিয়ে কোনো প্রশ্ন আসেনি, ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি বা শেয়ারবাজার লুটপাট নিয়ে কোনো আলোচনা ওঠেনি

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টাকা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, যারাই ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলা ত্বরান্বিত করার চেষ্টা চলছে এবং টাকা পুনরুদ্ধারের জন্য একদিকে জিটুজি কাজ চলছে, অন্যদিকে প্রাইভেট রিকভারি ফার্মগুলোও সক্রিয় রয়েছে।

এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপের অর্থ পাচার বিষয়ে পদক্ষেপ

হাসনাত আবদুল্লাহর আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপের অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ উদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ দেন। তিনি জানান, এই দুটি গ্রুপের বিষয়ে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, সাইপ্রাস, জার্সি, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এমএলএআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) পাঠানো হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই দুটি গ্রুপের পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারে ফৌজদারি কার্যক্রমের পাশাপাশি দেওয়ানি পদ্ধতিও অনুসরণ করা হচ্ছে। চারটি স্বনামধন্য বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে তাদের সম্পদ অনুসন্ধানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

অর্থ পাচার উদ্ধারের জটিলতা ও চলমান প্রচেষ্টা

অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধার একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনগত প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে এমএলএআরের জবাব পাওয়ার পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ, অপরাধলব্ধ অর্থ শনাক্তকরণ এবং দেশে-বিদেশের আদালতে অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব।

তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচার হয়েছে, তাদেরকেও এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আইনগত বা বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চলতি বা আগামী অর্থবছরে এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের কী পরিমাণ অর্থসম্পদ উদ্ধার সম্ভব, তা যথাযথভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সকল ধরনের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে এবং এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

হিসাব অবরুদ্ধ ও মামলার পরিসংখ্যান

হাসনাত আবদুল্লাহর অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি ও বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নামে পরিচালিত ৬৬২টি ব্যাংক হিসাবে মোট ২৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং বিও হিসাবে ৮১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তাদের অর্থ পাচারের বিষয়ে বাংলাদেশের আদালতে ২৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অর্থঋণ আদালত আইন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের কার্যক্রম চলমান বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণখেলাপির হার কমিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে যাতে ঋণখেলাপি না হয়, সেই বিষয়ে কৌশলপত্র প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেস ও সম্পত্তি অবরুদ্ধ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেস চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কেসগুলোর ক্ষেত্রে দেশের আদালত ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পত্তি অবরুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই প্রশ্নোত্তর পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আলোচিত এস আলম গ্রুপের নাম আবার আলোচনায় আসে সোমবার (২০ এপ্রিল) ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে পাল্টাপাল্টি সমাবেশের পর। এস আলম গ্রুপ একসময় এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে জানা যায়।