বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় ব্যবধানে হারের পরও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার এই অবস্থান পশ্চিমবঙ্গকে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী শনিবার নতুন বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণের আগে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মমতার অনড় অবস্থান
সোমবার ঘোষিত ফলাফলে বিজেপি ভূমিধস জয় পেলেও মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। এমনকি নিজের নির্বাচনি কেন্দ্র ভবানীপুরে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে হারলেও মমতা দাবি করেন, ‘আমরা হারিনি, আমি পদত্যাগ করব না।’ নির্বাচনে কারচুপি এবং তাকে গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরাইশি জানিয়েছেন, এটি অত্যন্ত বিরল একটি পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করলে রাজ্যপাল সংবিধানের ৩৫৬ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সুপারিশ করতে পারেন। তিনি বলেন, এক বা দুই দিনের জন্য হলেও এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসনই সবচেয়ে সম্ভাব্য সমাধান। কারণ বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ শেষ হলে তা ভেঙে দিতেই হবে। একই সঙ্গে দুজন মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকতে পারেন না।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুনীল ফার্নান্দেস বলেন, পদত্যাগ না করে মমতা কেবল সাংবিধানিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করছেন। এতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। সাধারণত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মমতার অনড় অবস্থানের কারণে এবার সেই সম্ভাবনা কম দেখা যাচ্ছে। যদি তিনি পদত্যাগ না করেন, তবে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মাত্র এক দিনের জন্য হলেও রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে।
সংবিধানে যা আছে
এস ওয়াই কোরাইশি উল্লেখ করেন, কোনও মুখ্যমন্ত্রী পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে করণীয় কী, সে বিষয়ে সংবিধানে সরাসরি কোনও বিধান নেই। তবে নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভার আস্থা থাকলেই কেবল একজন মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকতে পারেন। নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসন পাওয়ায় এবং তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে থমকে যাওয়ায় এটি স্পষ্ট যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শাসন করার অধিকার হারিয়েছেন। এখন দায়িত্ব রাজ্যপালের হাতে, তিনি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন।
কলকাতা হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়ন্ত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় বলেন, স্বাধীনতার পর আমরা এমন পরিস্থিতি কখনও দেখিনি। কোনও মুখ্যমন্ত্রী এর আগে এভাবে পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেননি। অতীতে ২০০৫ সালে বিহারে রাবড়ি দেবীর সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনও দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গের এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ এখানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পদ ছাড়তে চাইছেন না।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া



