বুথফেরত সমীক্ষা বনাম বাস্তব: পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের জয়ের ধারা
বুথফেরত সমীক্ষা বনাম বাস্তব: পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের জয়

বুধবার সন্ধ্যায় সর্বভারতীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত বুথফেরত সমীক্ষা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে জয়ী দেখালেও, তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব দুই দফার ভোটের চুলচেরা বিশ্লেষণের পর জানিয়ে দেয় যে, গতবারের মতো এবারও তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকছে। আসনসংখ্যা বেড়ে ২৩০-ও হতে পারে বলে দাবি তাদের।

সামাজিক মাধ্যমে অতীতের ভুল জরিপের প্রমাণ

একই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভরে যায় পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় নামী সমীক্ষক সংস্থাগুলো কীভাবে নিজেদের ভুল প্রতিপন্ন করেছিল, সেই পরিসংখ্যানে। ২০২১ সালের বিধানসভা ও ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমীক্ষক দলগুলো কীভাবে নিজেদের ভুল প্রতিপন্ন করেছিল, বুধবারের বুথফেরত সমীক্ষা জানাজানি হওয়ার পর থেকে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে শুরু করেছে।

সমীক্ষক সংস্থাগুলোর অবস্থান

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় যেসব সমীক্ষক সংস্থা তাদের অভিমত জানিয়েছে, তাদের কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত হলেও অধিকাংশই নতুন ও অনামী। ওই সংস্থাগুলোর মধ্যে দুটি তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনার কথা জানালেও ছয়টি সংস্থা বিজেপির পক্ষে রায় দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’, যারা অতীতে বেশ কয়েকবার নির্ভুল বুথফেরত জরিপ দিয়েছিল, তারা এক সর্বভারতীয় নিউজ চ্যানেলে তৃণমূলের পক্ষে পশ্চিমবঙ্গের ফল ক্ষণিকের জন্য জানিয়েও প্রত্যাহার করে নেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শোনা যাচ্ছে, আজ বৃহস্পতিবার কি আগামীকাল শুক্রবার তারা পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে নিজেদের জরিপ প্রকাশ করবে। ওই সংস্থা অবশ্য আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরি বিধানসভার ফল গতকালই প্রকাশ করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভুল ভবিষ্যদ্বাণী

সাম্প্রতিক অতীতের দুটি নির্বাচন, ২০২১ সালের বিধানসভা ও ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমীক্ষক দলগুলো কীভাবে নিজেদের ভুল প্রতিপন্ন করেছিল, গতকালের বুথফেরত সমীক্ষা জানাজানি হওয়ার পর থেকে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে শুরু করেছে।

বিগত বিধানসভায় ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া–ইন্ডিয়া টুডে’ জানিয়েছিল, তৃণমূলকে সামান্য ব্যবধানে হলেও বিজেপি পিছিয়ে দেবে। বিজেপি পাবে ১৩৪ থেকে ১৬০ আসন, তৃণমূল ১৩০ থেকে ১৫৬। চ্যানেলে আলোচনার সময় এদের অধিকাংশই ত্রিশঙ্কু বা ঝুলন্ত বিধানসভার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন।

যেমন ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ‘এবিপি নিউজ–সি ভোটার’ তৃণমূলকে দিয়েছিল ১৫২ থেকে ১৬৪ আসন, বিজেপিকে ১০৯ থেকে ১২১টি। ‘টুডে’জ চাণক্য’, বছর কয়েক ধরে যারা নির্ভুল রায় দিয়ে আসছিল, তাদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল তৃণমূল ১৬৯ থেকে ১৯১, বিজেপি ৯৭ থেকে ১১৯। ‘পি মার্ক’ও পুরোনো নামী সংস্থা। তাদের হিসাব ছিল, তৃণমূল ১৫২ থেকে ১৭২, বিজেপি ১১২ থেকে ১৩২। ‘টিভি ৯–পোলস্টার্ট’ বলেছিল, তৃণমূল পাবে ১৪২ থেকে ১৫২ আসন, বিজেপি ১২৫ থেকে ১৩৫। ‘ইন্ডিয়া টিভি–পিপলস পালস’–এর হিসাব ছিল তৃণমূল ৬৪–৮৮, বিজেপি ১৭৩–১৯২।

সেবার, মানে ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির স্লোগান ছিল—‘আব কি বার, দুশ পার’। অথচ সবার সব হিসাব গুলিয়ে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পায় ২১৩টি আসন। বিজেপি থমকে যায় ৭৭ আসনে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ভুল জরিপ

তিন বছর পর ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটেও চিত্রটিও ছিল একইরকম। সেবার বুথফেরত সমীক্ষার পর ‘এবিপি–সি ভোটার’ তৃণমূল কংগ্রেসকে দেয় ১৩ থেকে ১৭ আসন, বিজেপিকে ২৩ থেকে ২৭। ‘ইন্ডিয়া টুডে–অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ তৃণমূলকে দিয়েছিল ১১ থেকে ১৪টি, বিজেপিকে ২৬ থেকে ৩১ আসন। ‘এনডিটিভি–জন কি বাত’ তৃণমূলকে ১৬ থেকে ১৮ আসন দেয়, বিজেপিকে ২১ থেকে ২৬। ‘নিউজ ২৪–টুডে’জ চাণক্য’র হিসাব ছিল তৃণমূল ১৭, বিজেপি ২৪।

এ ছাড়া ‘সিএনবিসি–নিউজ ১৮’ বিজেপিকে দিয়েছিল ২১ থেকে ২৪টি আসন, তৃণমূলকে ১৮ থেকে ২১। সেবার ‘ম্যাট্রিজ’–এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘রিপাবলিক টিভি’। তারাও বিজেপিকে ২১ থেকে ২৫ আসনে এগিয়ে রেখে তৃণমূলকে দিয়েছিল ১৬ থেকে ২১। ‘রিপাবলিক টিভি’ আরও একটা জোট বেঁধেছিল সেবার। ‘পি মার্ক’–এর সঙ্গে। তাদের হিসাবে বিজেপি পেয়েছিল ২২, তৃণমূল ২০। ‘টাইমস নাউ–ইটিজি’র ভবিষ্যদ্বাণী ছিল তৃণমূল ২০, বিজেপি ২১। ‘টিভি ৯–পিপলস ইনসাইট–পোলস্টার্ট’ও তৃণমূলকে ২০টি আসন দিয়েছিল, বিজেপিকে ২১।

মোটকথা, সেবারও কেউই তৃণমূলকে বিজেপির চেয়ে বেশি দেয়নি। সবার কাছেই প্রাধান্য পেয়েছিল মোদি–মাহাত্ম্য।

ভোটের পর বাস্তবতা

ভোটের পর সেবারও ভুল প্রতিপন্ন হয়েছিল সবাই। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, তৃণমূল কংগ্রেস ২৯ আসনে জয়ী। বিজেপি ১২। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে পাওয়া ১৮ আসনের চেয়েও ৬ আসন কম।

বুথফেরত সমীক্ষা গতকাল রাত থেকে বিজেপি শিবিরের হাসি চওড়া করলেও তৃণমূল কংগ্রেসকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভিকট্রি সাইন’ দেখিয়ে বলেছেন, এবারও দুই-তৃতীয়াংশের নিচে তাঁরা থামবেন না।

তৃণমূলের দাবি, বুথফেরত সমীক্ষকদেরও বিজেপির চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। গণনা শুরুর আগে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার এটাও একটা কৌশল।