ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী পারাকালা প্রভাকর মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন এই রাজ্যসহ গোটা ভারতকে বিজেপি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তৈরির দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। তিনি বলেন, অ্যাডলফ হিটলারের আমলে নাৎসি জার্মানি যেভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তৈরি করেছিল বা যেভাবে ইসরায়েলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তৈরি করার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ও হচ্ছে, সেটাই ভারতে ঘটছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে গবেষণা
এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন নিয়ে বিশেষত ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বেশ ভালো গবেষণা করেছেন পারাকালা প্রভাকর। তাঁর আরেকটা পরিচয়, তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের স্বামী। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, তাঁর স্ত্রী বিজেপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের এই অর্থনীতিবিদ বিভিন্ন রাজ্যের সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন প্রভাকর। ভারতের গভীর সমস্যাগুলো কী, তা নিয়ে নানা বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। বেশ কয়েক মাস ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, সমাজ ও বর্তমান নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় এসআইআর নিয়ে কাজ করছেন।
এসআইআর-এর মাধ্যমে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক সৃষ্টি
প্রভাকর দীর্ঘ সময় কলকাতায় কাটিয়েছেন। এখানে থাকার সময়ে এসআইআর নিয়ে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সমাজের বড় অংশকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার একটা প্রক্রিয়া হচ্ছে এসআইআর। বিষয়টিকে প্রভাকর তুলনা করেন জার্মানির নাৎসি পার্টি প্রণীত ১৯৩৫ সালের ‘নুরেমবার্গ ল’-এর সঙ্গে। ‘নুরেমবার্গ ল’ বা আইনে ইহুদিদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং এরপরের তিনটি নির্বাচনে (নভেম্বর ১৯৩৩, ১৯৩৬ ও ১৯৩৮) জার্মানির পার্লামেন্টে সব আসন পেয়েছিল নাৎসি পার্টি।
এই প্রসঙ্গে উত্থাপন করে প্রশ্ন করা হলে ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পারাকালা প্রভাকর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার খুব দুঃখ লাগছে, এ রকম একটা তুলনা আজ আমাদের ভারতে টানতে হচ্ছে। কিন্তু কথাটা সত্য। ভারতে আজ দুধরনের মানুষ আছেন। প্রথম ধরন, যাঁরা ভারতের রাজনৈতিক সমাজভুক্ত ও দ্বিতীয় শ্রেণি, যাঁরা সেই রাজনৈতিক সমাজে স্থান পান না। এই দ্বিতীয় শ্রেণিকে আপনি আংশিক ভারতীয় বা দ্বিতীয় শ্রেণির ভারতীয় বলতে পারেন।’
ইসরায়েলের সঙ্গে তুলনা
প্রভাকর বলেন, ‘এটা বুঝতে গেলে আমাদের ইসরায়েলের দিকে তাকাতে হবে। আমরা একটা ইসরায়েল তৈরি করার চেষ্টা করছি, যেটাকে হিন্দু ইসরায়েল বলা যেতে পারে। ইসরায়েলে যেমন ফিলিস্তিনিরা আছেন, বিভিন্ন ধরনের আরব মানুষ আছেন বা বলা যেতে পারে ইহুদি নন এমন অনেক মানুষ আছেন, কিন্তু তারা ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমাজের অংশ নন। এখানেও তেমনই একটা শ্রেণি তৈরির চেষ্টা চলছে।’
প্রভাকরের মতে, ইসরায়েলে দীর্ঘকাল ধরে রয়েছে দেশে ফেরার আইন। বিশ্বে যেখানে যত ইহুদি আছেন, তাঁরা ইসরায়েলের ‘ল অব রিটার্ন’ (দেশে ফেরার) আইনের মাধ্যমে দেশে ফিরতে পারেন এবং কোনো সমস্যা ছাড়াই সে দেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। এই বুদ্ধিজীবী বলেন, ‘আমাদের এখানেও ঠিক এ রকম একটা আইন তৈরি করা হয়েছে, যা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (২০১৪) নামে পরিচিত। যেকোনো হিন্দু যিনি উপমহাদেশে আছেন, তিনি দেশে ফিরে আসতে পারেন। এটা তো ঠিক, ওই ইসরায়েলের আইনের ধাঁচে করা হয়েছে। সবকিছু কার্বন কপি হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু আইনের মূল বিষয়টা হলো এটাই।’
বাদ যাওয়া ২৭ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ
পশ্চিমবঙ্গে এবারে ভোটার তালিকা সংশোধন করে যে ২৭ লাখ মানুষকে শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হলো, তাঁদের শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে মনে করেন পারাকালা প্রভাকর। প্রভাকর বলেন, ‘নির্বাচনে যা–ই হোক, যে–ই জিতুক…আমার প্রশ্ন এই ২৭ লাখ মানুষের কী হবে। আমি যেটা দেখেছি, সেটা হচ্ছে নির্বাচনের পরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া এই মানুষদের কথা আর কেউ বলবেন না এবং তাঁরা এক প্রকার হারিয়েই যাবেন। যে দল জিতবে তারা এঁদের কথা মাথায় রাখবে না। যে দল হারল তাদের কথার বিশেষ কোনো দাম থাকে না।’
ভারতীয় এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘বাদ পড়া ভোটারদের অন্য রাজ্যে কী হয়েছে, সেটা দেখা দরকার। কেরালায় কী হয়েছে। তামিলনাড়ুতে কী হয়েছে। গুজরাটে কী হয়েছে। আসলে কিছুই হয়নি। এসআইআর তো বিহারেও হয়েছে, আমরা জানি প্রচুর মানুষ বাদ গেছেন। আপনি আমায় বলুন, নির্বাচনের পরে কত মানুষ এটা নিয়ে লড়াই করেছেন। এর প্রধান কারণ অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের কারণে মানুষের পক্ষে প্রাথমিকভাবে জানাই সম্ভব হয়নি, তাঁরা বাদ গেছেন। তারপরে আদালতে গিয়ে লড়াই করা আমাদের মতো দেশে অসম্ভব ব্যাপার। বস্তুত কিছুই হয়নি, এঁরা হারিয়ে গেছেন।’
বাদ যাওয়া ভোটারদের জন্য সংগঠনের প্রয়োজন
পারাকালা প্রভাকর প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কেউ কি বাতিল ভোটারদের সংগঠন বলে একটি সংগঠন গড়ে এঁদের নিয়ে সারা ভারতে লড়াই করবেন? অন্ততপক্ষে বাংলায় কি এটা হওয়া উচিত নয়? বাদ যাওয়া ভোটারদের সংগঠন গড়ে কি এঁদের নিয়ে মাঠে নামার প্রয়োজন নেই?’ প্রভাকরের সঙ্গে আলাপকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য দোলা সেন। তিনি বলেন, ভোটারদের নির্বাচনী প্রচারে নিয়ে এসে এটা বলানো দরকার ছিল, ‘আমরা ভোটার কিন্তু আমাদের বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো দলই সেটা শেষ পর্যন্ত করে উঠতে পারেনি। অর্থাৎ বাদ যাওয়া ২৭ লাখ ভোটারকে নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত আর কেউ–ই ভাবেননি। এটা প্রমাণ করছে, ভবিষ্যতেও তাঁদের কথা আর কেউ মনে রাখবে না।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য জানাচ্ছে, তারা মানুষের নাম যুক্ত করছে। বুধবার দ্বিতীয় ও শেষ দফায় ১৪২ আসনে নির্বাচনের আগে ২৭ লাখের মধ্যে ১ হাজার ৪৬৮ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল ১৫২ আসনে নির্বাচনের আগে ১৩৯ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ মোট ২৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ৬০৭ জন ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করা হলো।



