ক্রান্তিকালীন ইনসাফ: বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
ক্রান্তিকালীন ইনসাফ ও বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

ক্রান্তিকালীন ইনসাফ বা ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ ধারণাটি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সমাজ বা রাষ্ট্র গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, সেখানে পদ্ধতিগতভাবে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বহু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি জড়িয়ে পড়েন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল প্রচলিত আদালত বা বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ইনসাফ কায়েম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে আদালতের বিচার করার কথা, দেখা যায় তারাই পূর্ববর্তী শাসনামলের যাবতীয় সহিংসতার আইনি সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল। অন্যদিকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ক্ষত সমাজে গভীর দাগ ফেলে, যা কেবল আইন-আদালতের বিচার দিয়ে নিরাময় সম্ভব নয়। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত বিচারপ্রক্রিয়া ইনসাফের পরিবর্তে প্রতিহিংসায় রূপ নেয়। তাই সহিংসতা-পরবর্তী সমাজে কীভাবে এমন এক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব, যেখানে অতীতের যন্ত্রণা ও ট্রমার নিরাময় হবে এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধের গ্যারান্টি তৈরি হবে, সেই ভাবনা থেকেই ক্রান্তিকালীন ইনসাফ ধারণার উদ্ভব। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা ও চিলির অভিজ্ঞতা এই ধারণার বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।

সহজ ভাষায়, অতীত সহিংসতার মুখোমুখি হওয়া, তা মোকাবিলা করা এবং ট্রমা থেকে নিরাময়ের জন্য বিচারিক ও অ-বিচারিক পদ্ধতির সমন্বিত প্রক্রিয়াই ক্রান্তিকালীন ইনসাফ। এর মূল উপাদান হলো সত্য উদঘাটন ও স্বীকৃতি, বড় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধ। চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা নয়, বরং সহিংসতার ফলে বিভক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা। অতীতের ক্ষত ও সামষ্টিক ট্রমার নিরাময় না করে কেবল ‘এগিয়ে’ যাওয়ার চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি থেকে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্রান্তিকালীন ইনসাফের পদক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

ক্রান্তিকালীন ইনসাফ প্রক্রিয়ায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ট্রুথ কমিশন, ক্ষতিপূরণ, স্মৃতিসৌধ নির্মাণসহ নানা পদক্ষেপ রয়েছে। তবে এই নিবন্ধে কেবল একটি দিকের ওপর আলোকপাত করা হবে: প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ক্রান্তিকালীন ইনসাফের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধ। স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে রাষ্ট্র যখন পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের ভূমিকা সবচেয়ে প্রকট হয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নীরব থাকলেও এই দুই অঙ্গের সক্রিয়তা ছাড়া রাষ্ট্রপ্রণোদিত সহিংসতা সম্ভব হয় না। এতে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গভীর অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। কেবল কয়েকজন ব্যক্তির গ্রেপ্তার বা বিচারে এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই অনাস্থা দূর ও পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ক্রান্তিকালীন ইনসাফের অনিবার্য পদক্ষেপ। সহিংসতা ও মানবাধিকার ইস্যু মুখ্য হওয়ায় আইন-আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের দাবি সবার আগে আসে। স্বৈরাচারী শাসনে পুলিশ ও বিচার বিভাগ দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাই এদেরকে মানবাধিকার রক্ষায় দায়বদ্ধ করে গড়ে তুলতে হয়। কেবল দোষী ব্যক্তিদের সাজা বা পদ বদল করে নয়, প্রয়োজন আইনি কাঠামোর পরিবর্তন। পুরনো আইনি ও সাংগঠনিক কাঠামো সরিয়ে নতুন কাঠামো দাঁড় করানোই লক্ষ্য।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক ইতিহাস সহিংসতাপ্রবণ; প্রতিটি পক্ষের নানা মাত্রায় নিপীড়িত হওয়ার ক্ষত রয়েছে। রাষ্ট্রের দানবীয় রূপও বারবার দেখা গেছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে এই প্রাণঘাতী চেহারা স্পষ্ট হতে শুরু করে, যা গত দেড় দশকের স্বৈরাচারী আমলে চরম রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ২০০০ সালের পর বিএনপি শাসনামলে ‘ক্রসফায়ার’ নামে র্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়; আন্তর্জাতিক সংস্থা র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। ২০০৮ সালের পর আওয়ামী শাসন সেই হত্যাকাণ্ডের ধারা জারি রেখে আরও সংগঠিত ও ব্যাপক আকার দেয়, সাথে যুক্ত হয় গুম। রাজপথে আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যাও ছিল গত শাসনামলের বৈশিষ্ট্য। ২০১৩ সালে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, বিভিন্ন আন্দোলন দমনে বাহিনীর প্রতিক্রিয়া—এসব জুলুমের পরিধি বোঝা যায়। বিচার দূরে থাক, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পুরস্কৃত করার নজিরও রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দায়মুক্তিই যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান চরিত্রে পরিণত হয়েছিল। লক্ষণীয়, এই সহিংসতার বিচারের উদ্যোগ নিলেও তা প্রায়ই প্রতিহিংসাপ্রবণ হয়ে ওঠে, যা সহিংসতার নতুন চক্র তৈরি করে।

রাষ্ট্রপ্রণোদিত সহিংসতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। মাত্র ২০ দিনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আট শতাধিক নাগরিককে হত্যা করে। এই সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর যে সংস্কার আলাপ শুরু হয়েছে, তাকে ক্রান্তিকালীন ইনসাফের দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া জরুরি। রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। ৫ আগস্টের পর পুলিশের নবনিযুক্ত আইজিপির দুঃখপ্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল পুলিশসহ বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে ন্যূনতম অনুশোচনা দেখা যায় না। সব পক্ষ নিজেদের আমলের সহিংসতাকে ‘জায়েজ’ মনে করে, ফলে বিরোধী পক্ষের অপরাধের সমালোচনা করে নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টাই প্রধান প্রবণতা।

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার প্রচেষ্টা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর সংস্কারের দাবি জোরেশোরে ওঠে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনের প্রতিবেদনে আইনি সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ, ঔপনিবেশিক আইন পরিবর্তন, র্যাব বিলুপ্তি এবং ডিজিএফআইয়ের কার্যক্রম সীমিত করার সুপারিশ ছিল। পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠিত হয়, যা ক্রান্তিকালীন ইনসাফের জন্য জরুরি পদক্ষেপ। কিন্তু অন্যান্য কমিশনের মতো পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনও আড়ালে পড়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’ জারি করলেও টিআইবি একে ‘গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উপহাস’ বলে অভিহিত করে। তাদের মতে, এটি পুলিশের ওপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করবে। অধ্যাদেশটি আলোর মুখ দেখেনি; নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার এটি সংসদে উত্থাপন করেনি, ফলে কার্যকারিতা লোপ পেয়েছে। একইভাবে গুম, মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোর কোনোটি সংসদে পাস হয়নি; বরং এসব নিয়ে সরকারি দলের নেতাদের ভাষ্য দুঃখজনক।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করার বিপদ

বাংলাদেশের মতো সহিংসতাপ্রবণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করার বিপদ বহুমুখী। প্রথমত, ক্রান্তিকালীন ইনসাফের মূল উদ্দেশ্য হলো সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধ। অপরাধীদের শাস্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, টেকসই গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্য নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আস্থার সম্পর্ক জরুরি। সহিংসতার স্মৃতি নাগরিকের তীব্র অনাস্থা তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের জীবনে যে সহিংসতা চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে আস্থা ন্যূনতম। আস্থা তৈরি না হলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সুষ্ঠু হবে না, বরং নাগরিকের ক্ষোভ ও ট্রমা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে, যার আলামত ইতিমধ্যে স্পষ্ট।

এককালে সাম্রাজ্যবিরোধিতা যেমন বিপ্লবের হাতিয়ার ছিল, এখন মানবাধিকার ও ইনসাফের ধারণা সেই ভূমিকা পালন করছে। গত ২০ বছরে বিশ্বজুড়ে অভ্যুত্থানের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনই অভ্যুত্থানের বীজ পুঁতছে। রাষ্ট্রের দানবীয় চেহারার বিপরীতে প্রাণাধিকার লড়াইয়ের স্লোগান হয়ে উঠছে। মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়াতেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। নাগরিকের মৃত্যুই রাজপথে টেনে এনেছিল সহনাগরিকদের।

আমরা এখনো ইনসাফ বলতে কেবল আইন-আদালতের দ্বারস্থ হওয়াকেই বোঝাচ্ছি। কিন্তু যে রক্তাক্ত প্রান্তর পার হয়ে এসেছি, তার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে টেকসই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে। কিন্তু তা হয়নি; হয়েছে কেবল প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ‘চেহারা’র বদল। পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল, সমালোচনা হয়েছিল যে শুধু পোশাকি পরিবর্তনে কী হবে? সম্প্রতি সেই পোশাকও আবার বদলে যাচ্ছে। এই পোশাকি পরিবর্তনও না করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়াকে রূপকার্থেও পড়া যায়। এহেন পরিস্থিতিতে ‘প্রতিশোধ’মূলক পদক্ষেপকে বিচারের নামে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আলামত সে ধারণাই দিচ্ছে। এটি নাগরিকদের জন্য অশনিসংকেত বটে!