সাদিক অ্যাগ্রো মামলায় ১৩৩ কোটি টাকার অভিযোগ কমে দেড় কোটি, তদন্তে ভুল স্বীকার সিআইডির
সাদিক অ্যাগ্রো মামলায় ১৩৩ কোটি টাকার অভিযোগ কমে দেড় কোটি

সাদিক অ্যাগ্রো লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৩৩ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলায় তদন্ত শেষে সিআইডি জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ সম্পদ মাত্র দেড় কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ৮৬ লাখ টাকা। তদন্তে অনুমোদনহীন ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি ও আত্মসাৎ এবং সরকারি খাল ও সড়ক দখলের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মামলার পটভূমি

২০২৪ সালের ঈদুল আজহার আগে সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ১৫ লাখ টাকায় একটি 'উচ্চবংশীয়' ছাগল কিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান (ইফাত)। এই ঘটনার পর মতিউর রহমানের পাশাপাশি সাদিক অ্যাগ্রোর নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে।

২০২৫ সালের ৩ মার্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় সাদিক অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান মো. ইমরান হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলমের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে সিআইডি। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে গত এপ্রিলে ইমরান ও তৌহিদুলকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সংস্থাটি। গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ইমরান, তৌহিদুল পলাতক।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য

সিআইডির করা প্রাথমিক মামলায় অভিযোগ ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা চোরাচালান, প্রতারণা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ১৩৩ কোটি ৫৫ লাখ ৬ হাজার ৩৪৪ টাকা মানি লন্ডারিং করেছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ১২১ কোটি ৩২ লাখ ১৫ হাজার ১৪৪ টাকা স্থানান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগও ছিল।

তবে তদন্ত শেষে সিআইডি অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে প্রতারণা, জালিয়াতি, চোরাচালান, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মাধ্যমে সাদিক অ্যাগ্রোর নামে মোট ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬৬৮ টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জন করা হয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইমরান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অনুমোদনহীন ব্রাহমা গরু আমদানি করে প্রায় ৮৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

তদন্তকর্মকর্তার বক্তব্য

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির আর্থিক অপরাধ (ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম) বিভাগের পরিদর্শক মো. ছায়েদুর রহমান ১ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, 'মামলা করার সময় ব্যাংকে লেনদেনের ১৩৩ কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করা হয়েছে ধরে ভুল করে মামলা করা হয়েছিল। মামলার তদন্তে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।'

তবে সিআইডির আর্থিক অপরাধ নিয়ে কাজ করা একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'ভুল মামলায় হয়েছে; নাকি তদন্ত কর্মকর্তা 'ম্যানেজ' হয়ে এভাবে অভিযোগপত্র দিয়েছেন, তারও তদন্ত হওয়া দরকার। এই ভুলের কারণে আসামিরা আদালতে সুবিধা পাবেন।'

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক ইমরানের সঙ্গে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী ও বরখাস্ত হওয়া মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ পুলিশ–র‍্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সখ্য ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তা ইমরানের মাধ্যমে ঘুষের টাকা লেনদেন করতেন। গরুর ব্যবসার আড়ালে তিনি নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন।

ব্রাহমা গরু আমদানি ও পাচার

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালে সাদিক অ্যাগ্রো যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০টি গাভিন ব্রাহমা হিফার গরু আমদানির অনুমতি চেয়েছিল। তবে জাতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালার কারণে সেই আবেদন বাতিল হয়। এরপর অনুমোদন ছাড়াই ১৮টি ব্রাহমা গরু দেশে আনা হয়। এ জন্য বিমানবন্দরের লাইভস্টক কোয়ারেন্টাইন স্টেশনের এক কর্মকর্তার সই জাল করে ভুয়া আমদানি অনুমতিপত্র তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গরুগুলো জব্দ করে সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে পাঠায়। সিআইডি বলছে, এই অবৈধ আমদানি প্রক্রিয়ায় সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে প্রায় ৮৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পবিত্র রমজানে স্বল্প মূল্যে মাংস বিক্রির জন্য বাজেয়াপ্ত ১৫টি ব্রাহমা গরু জবাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব গরু বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে কাগজে-কলমে জবাই দেখানো হলেও ছয়টি গরু আত্মসাৎ করা হয়। প্রাণীগুলোকে কোরবানির হাটে বিক্রির চেষ্টাও চলে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে গরুগুলো উদ্ধার হয়। পরে আদালতের নির্দেশে নিলামে বিক্রি করে ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

সরকারি খাল দখল

ছাগল–কাণ্ডের পর ২০২৪ সালের ২৭ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) খাল ও সড়কের জায়গায় তৈরি করা সাদিক অ্যাগ্রোর স্থাপনায় উচ্ছেদে অভিযান চালায়। তবে এর পরও অবৈধ দখল ছাড়েনি সাদিক অ্যাগ্রো। মোহাম্মদপুরে নবীনগর হাউজিংয়ে মূল সড়কের পাশেই সাদিক অ্যাগ্রোর গরুর খামার এবং মিষ্টি ও বেকারির দোকান। ১ জুলাই সরেজমিনে দেখা যায়, খাল ও সড়কে জায়গা এখনো সাদিক অ্যাগ্রোর দখলে রয়েছে। সেখানে বালু ফেলে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

গরুর খামারের একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খামারের ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে গরু এনে এখানে বেঁধে রাখা হয়। খামারে এখন প্রায় ১০০টি গরু রয়েছে। দায়িত্বশীল কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইলে শ্রমিকেরা এই প্রতিবেদকে জানান, মালিক জেলে রয়েছেন। যাঁকে ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তিনিও এখন নেই।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাদিক অ্যাগ্রো মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালের সরকারি জমি ও বেড়িবাঁধের রাস্তা ভরাট করে চারটি স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করেছে। সিআইডির হিসাবে, এর মাধ্যমে তারা ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৮ টাকা অপরাধলব্ধ আয় করেছে।

ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ

তদন্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ৭৪টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করে সিআইডি। এর মধ্যে অপরাধলব্ধ অর্থের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতের আদেশে ২৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ গবাদিপশু আমদানির আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং অর্থ পাচারের উৎস অনুসন্ধানে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমএলএআর) চেয়ে বিদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ইমরানকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনের ফরেনসিক পরীক্ষায় গবাদিপশু কেনাবেচা-সংক্রান্ত হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও ভয়েস রেকর্ড উদ্ধার করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুলকে পলাতক উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।

সাদিক অ্যাগ্রো ২০২১ সালে ই-টিআইএন নিলেও তদন্ত চলা পর্যন্ত কোনো আয়কর রিটার্ন দাখিল করেনি বলে সিআইডির অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।