অযোধ্যার রামমন্দিরের সম্পদ লুট: পদত্যাগ করলেন চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র
রামমন্দিরের সম্পদ লুট: পদত্যাগ করলেন চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র

ভারতের অযোধ্যার রামমন্দিরের সম্পদ লুটের অভিযোগে অছি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই ও সদস্য অনিল মিশ্রর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। গত সোমবার মন্দিরের অছি পরিষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ট্রাস্টের অন্তর্বর্তীকালীন সাধারণ সম্পাদক পদে নিযুক্ত করা হয়েছে সাবেক আমলা কৃষ্ণ মোহনকে, যিনি ট্রাস্টের সদস্য।

নতুন সিইও নিয়োগ ও তদন্ত কমিটি

শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের বৈঠকে মন্দির পরিচালনার জন্য একজন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল রয়েছেন। এই কমিটি গঠনের ঘোষণা সোমবারই দেওয়া হয়।

ট্রাস্টের শূন্য পদ ও তদন্ত প্রতিবেদন

ট্রাস্টের মোট সদস্য ১৫ জন। এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং দুজন পদত্যাগ করেছেন। শূন্য পদে নতুন নিয়োগ হবে ট্রাস্টের পরবর্তী বৈঠকে, যা ২২ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। তার আগেই বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) রিপোর্ট পেশ হওয়ার কথা। চম্পত রাই ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক এবং অনিল মিশ্র সদস্য ছিলেন। আরেক অভিযুক্ত গোপাল রাও, যিনি বিশেষ আমন্ত্রিতদের একজন ছিলেন, তাকেও অপসারণ করা হয়েছে। তাঁরা তিনজনই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতৃস্থানীয় সদস্য।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আরএসএসের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব

এখন থেকে মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব সরাসরি হাতে নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। কৃষ্ণ মোহন আরএসএসের সদস্য। ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ গোবিন্দ গিরি গণমাধ্যমকে বলেন, 'মন্দিরের লুট গভীর বেদনার ও লজ্জার। ওই ঘটনা আমাদের প্রত্যেককে আহত করেছে। এই ঘটনায় ট্রাস্টের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। সেই ভাবমূর্তি ফেরত আনাই হবে আমাদের প্রথম কাজ।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দানের পরিমাণ ও খরচের হিসাব

গতকালের বৈঠকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত মন্দিরে দানের পরিমাণ ও খরচের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। জানানো হয়, ওই সময়ের মধ্যে ভক্তরা দান করেছেন ৫৮২ কোটি রুপি এবং মন্দির চালাতে খরচ হয়েছে ৩১৯ কোটি রুপি। বাকি টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে। তবে এই হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—দৈনন্দিন খরচে ৩১৯ কোটি রুপি কীভাবে খরচ হলো, তার বিস্তারিত হিসাব না দেওয়ায়। বৈঠকে আরও জানানো হয়, ট্রাস্ট গঠনের পর থেকে মোট ৩ হাজার ২৪৬ কোটি রুপি দান এসেছে, যার মধ্যে মন্দির নির্মাণে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৩৭০ কোটি রুপি।

চুরির পদ্ধতি ও সোনা-রুপার চালান

রাজ্য সরকার গঠিত সিট তদন্তে কী কী তথ্য প্রকাশিত হবে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গেছে, দানপাত্র থেকে চুরি হওয়া সোনা-রুপার গয়না অযোধ্যা, ফৈজাবাদ বা লক্ষ্ণৌয়ের স্বর্ণকারদের কাছে না পাঠিয়ে ট্রেনে করে বেঙ্গালুরু পাঠানো হতো। সেখানে তা গলিয়ে সোনা-রুপার বাট তৈরি করা হতো। চালানের হিসাবে গরমিল থাকত, যেমন ২০ কেজি সোনার গয়না পাঠানো হলে চালানে কম দেখানো হতো এবং বাড়তি সোনা চলে যেত চোরেদের কাছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা ও সমীক্ষার ফল

রামমন্দিরের লুট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো নীরব। তিনি এ বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। সি-ভোটার সংস্থার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ মানুষ অভিযোগকে 'গুরুতর' এবং ৬৩ শতাংশ 'অত্যন্ত গুরুতর' মনে করেন। এই চুরি ৫৩.৭০ শতাংশ এনডিএ সমর্থকের বিশ্বাস নাড়িয়ে দিয়েছে। সমীক্ষা বলছে, সমর্থকেরা মনে করেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে এবং হিন্দুধর্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এর ফলে বিজেপির বিশ্বস্ত ভোটব্যাংকে চিড় ধরতে পারে।

মোদির দায় এড়ানোর অক্ষমতা

প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করলেও, ডি ওয়্যার-এর এক নিবন্ধে ছয়টি কারণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে তিনি ও বিজেপি এই দায় এড়াতে পারেন না। প্রথমত, রামমন্দির নির্মাণ ছিল বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক আন্দোলন, যার কৃতিত্ব মোদি দাবি করে এসেছেন। দ্বিতীয়ত, মোদিই ট্রাস্ট গঠন করেছেন এবং ১২ জন সদস্য তাঁর সুপারিশে নিযুক্ত। তৃতীয়ত, চম্পত রাই বিজেপি-আরএসএস ইকোসিস্টেমের অংশ এবং মোদির ঘনিষ্ঠ। চতুর্থত, এই ঘটনা মোদির দুর্নীতিবিরোধী ও হিন্দুত্বের ধারক হিসেবে ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। পঞ্চমত, এটি নিছক চুরি নয়, বরং ২০০ জনের একটি সিন্ডিকেটের কাজ। ষষ্ঠত, বিরোধী দলগুলি মোদির নীরবতাকে কটাক্ষ করছে এবং বলছে, তিনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

ভোটারদের মনোভাব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

সমীক্ষায় ৬৬ শতাংশ এনডিএ ও ৬৩ শতাংশ বিরোধী ভোটার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। এক-তৃতীয়াংশ মনে করেন ট্রাস্টই দায়ী। প্রায় ৫০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ মনে করেন, এই চুরি উত্তর প্রদেশ বিধানসভার আগামী নির্বাচনে যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে যেতে পারে। ৩৩ শতাংশ জনতা ট্রাস্টকে দায়ী করছেন, যা মোদি গঠন করেছিলেন। ১০ শতাংশ স্থানীয় প্রশাসন এবং ১৭ শতাংশ মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে দায়ী করছেন। ১৮ থেকে ২৪ বছরের ভোটারদের ৫৮ শতাংশ মনে করেন, ভোটে এর প্রভাব পড়বে এবং তা যোগী প্রশাসনের বিরুদ্ধে যাবে।