রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থিত ইয়ামেনি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামক একটি আবাসিক হোটেলে প্রায় আট মাস ধরে অবস্থান করে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) পাঁচ শীর্ষ নেতা প্রায় ১১ লাখ টাকা বকেয়া রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৫ জুলাই ২০২৫ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তারা হোটেলের দুটি কক্ষ ব্যবহার করেন এবং বিল পরিশোধ না করেই চলে যান।
অভিযুক্ত নেতারা কারা?
হোটেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগে এনসিপির ঢাকা দক্ষিণ মহানগর কমিটির পাঁচ নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন: ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার (ঢাকা দক্ষিণ মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব), সাদেক মির্জা (ঢাকা দক্ষিণ মহানগর এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক), মিরাসাত হোসেন হিমেল (যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান সমন্বয়ক), শাখাওয়াত হোসেন এবং তৌসিফ।
অভিযোগের বিবরণ
হোটেলের হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাজল জানান, সরকার পতনের পর ওই পাঁচ নেতা আওয়ামী লীগ অফিস সংস্কারের অজুহাতে হোটেলের ৭২৫ ও ৭২৭ নম্বর কক্ষ দুটি ভাড়া নেন। প্রতিটি কক্ষের দৈনিক ভাড়া ৩ হাজার টাকা। প্রায় আট মাসে মোট বকেয়া দাঁড়ায় ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা। বুকিংয়ের সময় তারা মাত্র ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন, এরপর আর কোনো টাকা পরিশোধ করেননি।
মোহাম্মদ কাজল আরও বলেন, রাতে তারা হোটেলে নারী আনতেন এবং অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে তারা হুমকি দিয়ে বলতেন, 'আপনারা নিজের কাজ করেন, আমরা আমাদের কাজ করি।' জাতীয় নির্বাচনের পরের দিন সকালে তারা কক্ষের চাবি না দিয়েই চলে যান। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ তালা ভেঙে কক্ষ দুটি পরিষ্কার করে নতুন তালা লাগায়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
প্রধান অভিযুক্তের রাজনৈতিক পটভূমি
অভিযোগের তদন্তে জানা যায়, প্রধান অভিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ সাংসদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বাবা ছিলেন সাবেক সাংসদ কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর ব্যক্তিগত সহকারী। গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে এনসিপিতে যোগ দেন এবং রাতারাতি ঢাকা দক্ষিণ মহানগরের সদস্য সচিব হন।
প্রাক্তন গণঅধিকার পরিষদ নেতা রাশেদ খান ফেসবুকে লিখেছেন, শাহরিয়ার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত সাংসদ মনুর প্রটোকল অফিসার ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি এনসিপির শীর্ষ নেতা হন। রাশেদ খানের মতে, শাহরিয়ারকে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছিল কারণ তিনি জানতেন আওয়ামী লীগের সম্পদ কোথায় এবং কীভাবে সেগুলো দখল করা যায়। তিনি আরও দাবি করেন, গত ঈদ-উল-আযহায় গোলাপবাগ কোরবানির বাজারে এনসিপি নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করা প্রায় দেড় কোটি টাকা তিনি এককভাবে আত্মসাৎ করেন।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
প্রধান অভিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'হোটেল রুম ভাড়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। নারী নিয়ে হোটেলে থাকার প্রশ্নই আসে না। যে ব্যক্তি তা করছে সে আমি নই।' তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সাথে জড়িত থাকার একটি ভিডিও সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, এটি ২০২৩ সালের পুরনো ভিডিও।
অভিযোগ আংশিক স্বীকার করে এনসিপি নেতা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, তার নামে কক্ষ বুকিং না হলেও তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, মাঝে মাঝে দুটি কক্ষে পাঁচ, সাত বা দশজনও থাকতেন। তবে ভাড়া সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান নেই। সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক মির্জা দাবি করেন, তিনি রাজনৈতিক কারণে মাত্র এক-দুইবার সেখানে গিয়েছিলেন।
এনসিপির অবস্থান
লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, যেহেতু লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে, তাই দলের শৃঙ্খলা কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি দলের নেতারাই চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং দল তাদের আশ্রয় দেয়, তাহলে তা শহীদদের আত্মত্যাগের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।



