ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি রুপি অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মন্দিরটি উদ্বোধন করেছিলেন। প্রায় আড়াই বছর পর মন্দিরটি এখন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিকভাবে স্পর্শকাতর শহর অযোধ্যায় ১৬ শতকে নির্মিত একটি মসজিদের স্থানে মন্দিরটি গড়ে তোলা হয়েছে। ১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী মসজিদটি ভেঙে ফেলেছিল, যা দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে এবং প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
মন্দিরের আয় ও অনুদানের পরিমাণ
মন্দিরটি ২ দশমিক ৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এবং তিনতলাবিশিষ্ট। উদ্বোধনের পর এটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রতিবছর পাঁচ কোটির মতো দর্শনার্থী এখানে আসেন। মন্দির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২৭ কোটি রুপি আয়ের হিসাব নথিভুক্ত করেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়ের দিক থেকে এটি ভারতের বৃহত্তম মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ছয়টি ছোট মন্দিরসহ পুরো রামমন্দির কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভক্তের সমাগম হয়। সপ্তাহান্তে ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে এ সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। অধিকাংশ ভক্ত মন্দির প্রাঙ্গণে স্থাপিত প্রায় ৩৫টি দানবাক্সে অনুদান দিয়ে থাকেন।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ও তদন্ত
অযোধ্যার সাবেক এক বিধায়ক অভিযোগ করেছেন, মন্দিরের সাত কোটি রুপির বেশি অর্থের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না এবং তা আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ট্রাস্ট এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছে। তদন্ত দলের দেওয়া অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার অযোধ্যা পুলিশ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা করেছে। মামলায় আটজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা গৌরব গ্রোভার বিবিসি হিন্দিকে বলেছেন, “আটজন অভিযুক্ত ব্যক্তিই বর্তমানে নিরাপত্তা হেফাজতে আছেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দু–এক দিনের মধ্যে তাঁদের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হতে পারেন।”
অভিযোগ উন্মোচন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিতর্কের সূচনা হয় মহিপাল সিংয়ের মাধ্যমে, যিনি আগে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগ তদারকি করতেন। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, নগদ অনুদান ও উপহার হিসেবে পাওয়া মূল্যবান ধাতুর ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে প্রশ্ন তোলার পর তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিবিসি হিন্দির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রাণনাশের হুমকির কথা উল্লেখ করে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। মহিপাল বলেন, “আমি হত্যার হুমকি পেয়েছি। আমি প্রচণ্ড চাপ ও মানসিক উদ্বেগের মধ্যে আছি। এ মুহূর্তে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।” তাঁর অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
৭ জুন সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন এবং তদন্তের দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি অনুদান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন এবং বিষয়টিতে ‘স্বচ্ছতার অভাব’ দেখছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সমাজবাদী পার্টির নেতা ও অযোধ্যার সংসদ সদস্য আওয়াধেশ প্রসাদ বলেছেন, “বিষয়টি আদালতের তত্ত্বাবধানে গঠিত একটি তদন্ত দলের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা উচিত। তদন্ত চলাকালে ট্রাস্টের সদস্যদের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হোক।”
বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি বিজেপির কয়েকজন নেতাও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্থানীয় বিজেপি নেতা রাজনীশ সিং অনুদান ব্যবস্থাপনা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া
অযোধ্যার দীর্ঘদিনের বাসিন্দারা বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছেন, মন্দিরে দুর্নীতির অভিযোগে তাঁরা গভীরভাবে হতবাক হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা বিজয় লক্ষ্মী বলেন, “এ অনুদান মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও তীর্থযাত্রীদের কল্যাণের জন্য দেওয়া হয়। এটি ব্যক্তিগতভাবে কারও বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য নয়।” সন্তোষ পুরি নামের আরেক বাসিন্দা এ অভিযোগগুলোকে তাঁদের ধর্মের ওপর এক মারাত্মক আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বাসিন্দা অজয় কুমার ভার্মা অযোধ্যাকে ‘ভগবানের আবাসস্থল’ বলে উল্লেখ করে বলেন, “এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটার কথা নয়। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত। তাই তাঁরা এমন কাজ করবে বলে বিশ্বাস করা কঠিন।” বিপি পান্ডে নামের অপর এক বাসিন্দা এ অভিযোগকে সরকার ও ট্রাস্টের ওপর একটি ‘কলঙ্ক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।”
তদন্তের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ
তদন্ত সম্পন্ন করতে বিশেষ তদন্ত দল আরও সময় চেয়েছে। যাঁদের কাছে কোনো প্রমাণ আছে, তাঁদের তা তদন্তকারীদের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনি বলেন, “তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে।” ভক্তদের ফলাফল প্রকাশের আগে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর অনুরোধ জানিয়ে যোগী বলেন, “যারা রামমন্দির নির্মাণের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষা করেছেন, তাঁরা বিশেষ তদন্ত দলের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে পারবেন।”
একই সঙ্গে তদন্তের দায়িত্ব ফেডারেল পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি ক্রমে জোরালো হয়ে উঠছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের উচ্চ আদালতে একাধিক আবেদন করা হয়েছে, যেখানে পুলিশি মামলা দায়ের এবং বিচারকদের তত্ত্বাবধানে তদন্ত পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ আদালতের এক আইনজীবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যোগী আদিত্যনাথ এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, যাতে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “এগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক আয় ছিল না; বরং পবিত্র ধর্মীয় নিবেদন বা অনুদান ছিল। এই অর্থের কোনো অপব্যবহার বা আত্মসাৎ হলে তা হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র প্রতিষ্ঠানের প্রতি কোটি কোটি ভক্ত যে বিশ্বাস রেখেছেন, তার সঙ্গে গভীর বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।”



