ডাক অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তার আত্মীয়ের নগদ ডিস্ট্রিবিউটরশিপ: স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ
ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জাকির হাসান নূরের মামাতো ভাই মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান নগদের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পেয়েছেন। এই ঘটনায় স্বার্থের সংঘাত ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। গত বছর ১৪ জুন উত্তরায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের মামলায় জড়িয়ে পড়ে এই কেসটি।
ছিনতাই মামলা ও আত্মীয়তার যোগসূত্র
২০২৫ সালের ১৪ জুন ঈদুল আজহার ছুটির আগের দিন উত্তরার একটি সড়কে নগদের এক ডিস্ট্রিবিউটরের ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। মামলা করেন আবদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে নগদের ডিস্ট্রিবিউটর দাবি করেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, টাকার প্রকৃত মালিক মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান। তিনি জাকির হাসান নূরের মামাতো ভাই। মামলায় ব্যবহৃত উত্তরার বাড়িটি জাকির হাসানের পৈতৃক বাড়ি।
নগদের গোপন তালিকা ও ডিস্ট্রিবিউটরশিপ
নগদের অভ্যন্তরীণ গোপন তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১৬ জন পরিবেশকের মধ্যে ‘সরকারি কর্মকর্তা প্রভাবিত’ ক্যাটাগরিতে সাত ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছেন। তারিকুজ্জামানের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ—এম আর করপোরেশন, এম আর করপোরেশন-তুরাগ ও এম আর করপোরেশন-দক্ষিণখান—এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। নথিপত্রে দেখা যায়, তিনটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনকারী তারিকুজ্জামান এবং একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও পোস্টকোড ও ডাকঘরের নাম ভিন্ন।
উচ্চ লেনদেন ও আয়ের তথ্য
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, এম আর করপোরেশনের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ থেকে মাসিক ২০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এ থেকে কমিশন বাবদ মাসে ২৫ লাখ টাকা এবং সব খরচ বাদে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে। এই উচ্চ আয় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
জাকির হাসানের ভূমিকা ও দায়িত্ব
জাকির হাসান ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নগদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসেবে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও চুক্তি স্বাক্ষরে যুক্ত ছিলেন। ২০২১ সালে তাঁকে নগদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা তিনি গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
জাকির হাসান নূর কোনো অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘যেসব সময়ে নগদের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ দেওয়া হয়েছে, তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তারিকুজ্জামান আত্মীয় হলেও তাঁর ব্যবসার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ তারিকুজ্জামানও বলেন, ‘উনি ওনার চাকরি করেছেন, আমি আমার।’ তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া এটিকে সম্ভাব্য ‘প্রিয়তোষণ’ হিসেবে দেখছেন এবং তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, জাকির হাসানকে নিয়ে এমন কোনো অভিযোগ তাঁর কাছে কেউ করেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও উচ্চ লেনদেনের তথ্য স্বার্থের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা বিস্তারিত তদন্তের দাবি রাখে।



