মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে বালু উত্তোলনে ৪৫০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক প্রকল্পে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কোনো দরপত্র ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাগর থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে।
বালু বিক্রির লাভ ঠিকাদারের, খরচ সরকারের
প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও ড্রেজিং খরচ বাবদ ৪ টাকা ৫৬ পয়সা সরকারি কোষাগার থেকে ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ, বালু বিক্রি করে লাভ করবে ঠিকাদার, কিন্তু উত্তোলনের ব্যয় বহন করবে সরকার। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বিষয়টি স্বীকার করে দাবি করেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনগণের সম্পদের চরম লুটপাট বলে মন্তব্য করেছে।
কীভাবে তৈরি হলো লোপাটের সুযোগ
মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট বালুর প্রয়োজন। সরকারি হিসাবে, ভ্যাট বাদে প্রতি ঘনফুট বালুর নির্ধারিত মূল্য ৬ টাকা ৯৪ পয়সা ধরলে এই পরিমাণ বালু থেকে সরকারের অন্তত ৬৯৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের রয়্যালটি নির্ধারণে গঠিত সংশ্লিষ্ট উপকমিটির সদস্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) পৃথক প্রস্তাব জমা দেয়। উভয় সংস্থাই তাদের নির্ধারিত ‘শিডিউল অব রেটস’ অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ১৬ টাকা ৭০ পয়সা প্রস্তাব করে। অন্যদিকে, গণপূর্ত বিভাগ তাদের বিশ্লেষণে এই দর ১৬ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করলেও ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বালুর রয়্যালটি ধরা হয়েছে ৬ টাকা ৯৪ পয়সা।
এর ধারাবাহিকতায় কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’কে প্রাথমিকভাবে ১৩টি শর্তে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে প্রশাসন। ২ এপ্রিল জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সই করা চিঠিতে এ অনুমতি দেওয়া হয়। একই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাগর থেকে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলনে ঘনফুটপ্রতি ৪ টাকা ৫৬৬ পয়সা করে সরকারের রাজস্ব থেকে বহন করা হবে।
এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় সর্বনিম্ন ১০০ কোটি ঘনফুট বালুর বিপরীতে সরকারি রাজস্ব থেকে বালু উত্তোলনের খরচ বাবদ প্রায় ৪৫৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঠিকাদারের পকেটে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এদিকে ড্রেজিং খরচ সরকার পরিশোধ করায় সরকারি কোষাগারে রাজস্ব হিসাবে জমা হবে মাত্র ২ টাকা ৩৭৪ পয়সা।
প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব উপেক্ষা
‘উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সরকারের কোনো ব্যয় ছাড়াই প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ৫ টাকা ৩৭ পয়সা রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজ খরচে বালু উত্তোলনের প্রস্তাবও দেয়। এছাড়া আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ দর দিয়ে প্রতিযোগিতায় থাকলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়া তো দূরের কথা, অনুমোদন পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের আবেদনই করেনি। তিনি বলেন, এনভাইরনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) ছাড়া বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই এবং অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলন করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের ভূমিকা
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, তাদের কাছে শুধু বালুর রয়্যালটি নির্ধারণ বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছিল, তারা তা লিখিতভাবে দিয়েছেন। বাকি সিদ্ধান্তের এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের। পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত বিভাগ ও বিআইডব্লিউটিএ-এর কর্মকর্তারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে অনুমোদন ও ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। পরে গঠিত কমিটির সম্মতিতে বালুর রেট নির্ধারণ করে অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি ব্যয়ে বালু উত্তোলন করলে ঠিকাদার নির্ধারিত দামে বালু সরবরাহ করবে কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তিনি জানেন না তারা কত দামে দেবে।
গোপন চুক্তি ও অভ্যন্তরীণ লোপাট
অনুসন্ধান ও নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, সওজের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মুহাম্মদ আকবার হোসেন পাটোয়ারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টোকিও-এমআইএল-জেভির সঙ্গে ৩০ থেকে ৩৩ কোটি ঘনফুট বালু সরবরাহের গোপন চুক্তি করেছে। কিন্তু মাত্র ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের আবেদন করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের কাছে।
সূত্র বলছে, ২ টাকা ৩৭ পয়সা হারে সরকার বালুর মূল্য পেলেও সেই বালু ক্রয় দেখানো হবে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকা। পরিবহণ খরচসহ মিলিয়ে ২০ থেকে ৪০ টাকা সরকারের কাছ থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সেখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পাবেন পিডি মুহাম্মদ আকবার হোসেন পাটোয়ারী। এতে সরকার শত শত কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।
অনুমোদন পেতে কর্মকর্তা বদলি
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সালাউদ্দিনের কাছে বালু উত্তোলনের অনুমোদনের জন্য তদবির করে। তিনি প্রস্তাবিত এলাকার পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণ করে আবেদন করার পরামর্শ দেন। জেলা প্রশাসকের বদলির পর বালু উত্তোলনের অনুমতি পেতে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দিন আহমেদের কাছেও তদবির করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা। তিনিও অনড় অবস্থান নেওয়ায় উচ্চপর্যায়ে লবিং করে ১২ মার্চ তাকে বদলি করানো হয়। এরপর জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানকে ম্যানেজ করে অনুমোদন পেতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (এমআইএল) কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইখতিয়ার বলেন, এ বিষয়ে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত নন, তাই তিনি এসব অভিযোগ বা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।
টিআইবির তীব্র প্রতিক্রিয়া
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আয় যদি ঠিকাদারদের জন্য ব্যয় করার তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তবে এটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং কর্তৃত্ববাদী চর্চারই ধারাবাহিকতা, যা ১৬ বছর ধরে চলমান ছিল। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সম্পদ বিশেষ করে যেখানে উচ্চমূল্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে কম দামে কোনো বিশেষ মহলকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয়।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে ১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে ২৭.২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৪৭৬ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে বালু সরবরাহ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলি এখন তদন্তের দাবি রাখে।



