দুদকের অনুসন্ধান: সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশনকক্ষের সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ–সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানের সূচনা ও প্রক্রিয়া
দুদকের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাস। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে একাধিক নথি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। এতে জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলে ‘সিমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন সিস্টেম-এসআইএস’ পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ টেন্ডার বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ক্রয়/মেরামত করা হয়ে থাকলে মালামাল ক্রয়ের চাহিদাপত্র, প্রশাসনিক অনুমোদন, ব্যয় হিসাব, দরপত্রের নথি, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের পরিচয়সহ বিভিন্ন তথ্য সাত দিনের মধ্যে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, জাহিদুর রহিম জোয়ারদার, তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু প্রকৌশলীর যোগসাজশে সংসদ ভবনের এসআইএস পরিচালনা ও মেরামতের নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বেশি মূল্য দেখিয়ে (ওভার ইনভয়েসিং) বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ ছাড়া জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটার মাধ্যমেও শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিনে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন ও সংসদ ভবনে প্রবেশ করলে অধিবেশনকক্ষের এসআইএস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এটি সচল করতে উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড ক্ষতিগ্রস্ত সিস্টেমটি পরীক্ষা করে মেরামতের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব বলে মত দেয় এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। এরপর প্রকৌশলীদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
অনিয়মের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ‘সিউর’ ব্র্যান্ডের এ সিস্টেমের সমমানের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পণ্য বর্তমানে উৎপাদন না হলেও পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা চলছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেও গণপূর্তের কিছু কর্মকর্তা এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসআইএস মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৯ কোটি টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানায় দুদক।
এদিকে সম্প্রতি সংসদে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাটের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে শব্দযন্ত্রের ত্রুটির কারণে কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। পরদিনও হেডফোন ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্যরা। এরপর ৫ এপ্রিল আবারও শব্দযন্ত্র বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। সেদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, তাঁর নিজের শব্দযন্ত্রও কাজ করছিল না। পরে তা মেরামত এবং নামাজের বিরতির জন্য অধিবেশন ৪০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়।
তদন্ত ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
এ বিভ্রাট ‘অন্তর্ঘাত’ কি না, তা তদন্তে সংসদ কমিটি একটি কমিটি গঠন করেছে। সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। দুদক তাদের চিঠিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চার ধরনের তথ্য চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দরপত্র–সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নথি, প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজার যাচাই প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, স্টক রেজিস্টার, নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র। এ ছাড়া অর্থবছরভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, বর্তমান সিস্টেমের অবস্থা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সিস্টেমের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, এর আগে চাহিদা অনুযায়ী নথি না পাওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করতে সাত দিনের মধ্যে এসব নথি সরবরাহ জরুরি। এই অনুসন্ধান জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



