ইডিসিএল প্রকল্পে টানাপোড়েন: মানিকগঞ্জ না মুন্সীগঞ্জ, কোথায় হবে বাস্তবায়ন?
ইডিসিএল প্রকল্প: মানিকগঞ্জ না মুন্সীগঞ্জ বিতর্ক

ইডিসিএল প্রকল্পে টানাপোড়েন: মানিকগঞ্জ না মুন্সীগঞ্জ, কোথায় হবে বাস্তবায়ন?

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) এর প্রায় ১ হাজার ৯০৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প ঘিরে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে, যা সরকারি, বৈদেশিক ও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা।

প্রকল্পের পটভূমি ও স্থান বিতর্ক

সরকারি নথি অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩১.৫০ একর জমির ওপর আন্তর্জাতিক মানের নতুন স্থাপনা গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যেখানে তেজগাঁওয়ের প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ কারখানাটি স্থানান্তরের কথা ছিল। প্রায় ১০০ বিঘা জমির জন্য তিনটি সম্ভাব্য স্থানও চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কিন্তু ২০২৫ সালে এসে কার্যক্রম হঠাৎ থমকে যায়। এই স্থবিরতার পেছনে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না মিললেও পরে সামনে আসে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণভাবে সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এতে সংস্থাটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিল্প উপদেষ্টার সুপারিশে তার নিয়োগের পর থেকেই প্রকল্পের গতি বদলে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জমি দুর্নীতির অভিযোগ ও জটিলতা

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সময় প্রকল্প অনুমোদিত হলেও জমির শ্রেণি পরিবর্তন সংক্রান্ত দুর্নীতি ও জটিলতায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে জটিলতার জালে ফেঁসে যায় প্রকল্পটি। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা জমি অধিগ্রহণ ও জমির শ্রেণির পরিবর্তন নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভয়াবহ জালিয়াতি খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ২৫ হাজার টাকা থেকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা সুপরিকল্পিত মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে। ৮৪ নম্বর মেঘশিমুল মৌজায় ৩১.৫ একর জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক তৈরি হয়। সরকারি হিসাব বলছে, প্রকৃত শ্রেণি অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ হলে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, কিন্তু কাগজে-কলমে শ্রেণি বদলে সেই ব্যয় দেখানো হয় ১১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা—অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক চাপ।

জেলা প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য—প্রস্তাবিত জমির বড় একটি অংশ আগেই কিনে নিয়েছিলেন মন্ত্রী, তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা। প্রস্তাবিত ওই স্থানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিডি সান লিমিটেডের নামে কেনা হয় ৬ একর ৩৯ শতক জমি। মন্ত্রীর ছেলে রাহাত মালেকের মালিকানাধীন রাহাত রিয়েল এস্টেটের নামে কেনা হয় ৩ একর ১২ শতক জমি। অর্থাৎ সাড়ে ৩১ একর জমির মধ্যে ২০ একর ৬৫ শতাংশ জমি মন্ত্রী, তার ছেলে ও মেয়ে কিনেছেন।

স্থানান্তরের সম্ভাবনা ও বর্তমান অবস্থা

গত বছর উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল প্রতিষ্ঠানটির জন্য আবারও মানিকগঞ্জ পৌরসভার দুটি সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে, যার একটি উপযুক্ত বলেও বিবেচিত হয়। এরপর আর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জে সরকারি জমি থাকলেও সেখানে এখনো বড় কোনো অবকাঠামোগত কাজ শুরু হয়নি। বিপরীতে মানিকগঞ্জে প্রাথমিক উন্নয়ন শেষ হওয়ায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হলে আগের বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

করোনার পর ভ্যাকসিন উৎপাদন পরিকল্পনায় ইডিসিএলকে যুক্ত করার পর থেকেই বারবার স্থান পরিবর্তনের নজির পাওয়া যায়—প্রথমে মানিকগঞ্জ, পরে গোপালগঞ্জ, সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জ। এতে পুরো পরিকল্পনার স্বচ্ছতা নিয়েই সন্দেহ দানা বাঁধছে।

রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা চাচ্ছেন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি মানিকগঞ্জেই হোক। তিনি জানিয়েছেন, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের উন্নয়ন ও শিল্পায়নের লক্ষেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চল শিল্প স্থাপনের জন্য উপযোগী বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জনস্বার্থ ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বিবেচনায় প্রকল্পটি এখানেই বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন গত বুধবার।

এদিকে প্রকল্পটি স্থানান্তরের কলকাঠির পেছনে কারা প্রভাব রাখছেন, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না মেলায় ইডিসিএল প্রকল্প ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হাতছাড়া হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আর সেই কারণেই প্রকল্পটি কোথায় বাস্তবায়িত হবে—মানিকগঞ্জের নতুন কোনো স্থানে না মুন্সীগঞ্জ—তা এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।