অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার অধ্যাদেশ অনুমোদনে অনীহা: বিচার বিভাগ ও দুদকের স্বাধীনতা প্রশ্নে উদ্বেগ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গুম প্রতিরোধের উদ্যোগ হোঁচট খেয়েছে। ১০ এপ্রিলের পর থেকে এসব অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারানোর পথে রয়েছে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অধ্যাদেশ অনুমোদনে বিলম্ব: সংস্কারের পথে বাধা
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যার মধ্যে সংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য। সংবিধান অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে এসব অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হলেও ১০ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদন না পেলে সেগুলো কার্যকারিতা হারাবে। জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ১১৭টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের সুপারিশ করলেও বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার পরামর্শ দিয়েছে।
এই ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত দুটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুটি এবং দুদকসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ। বিশেষ কমিটির মতে, এসব অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো অনুমোদন না পাওয়ায় সংস্কার প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব ছিল, যা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করবে। এই ব্যবস্থা বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে সহায়ক হতো বলে বিশ্লেষকরা মত দেন। একইভাবে, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারতো, কিন্তু সেটিও এখনই অনুমোদন পাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগ, দুদক, মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যত বেশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ পায়, সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতা তত সীমিত হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। তবে, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এবং জুলাই জাতীয় সনদের ভিন্নমত বিবেচনা করে সংবিধান সংশোধন ও অন্যান্য সংস্কার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুদক শক্তিশালীকরণ ও গুম প্রতিরোধ
দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা বাড়ানো, সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান এবং বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এছাড়া, গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়, যাতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানাবলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা অধ্যাদেশও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যরা নোট অব ডিসেন্টে উল্লেখ করেছেন, এসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহি বৃদ্ধির চেষ্টা দৃশ্যমান।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আগামী সোমবার থেকে জাতীয় সংসদে অধ্যাদেশ অনুমোদনের কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। যেসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হবে, সেগুলোর পাশাপাশি বাতিল করা চারটি অধ্যাদেশও বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাধার মুখে পড়ল। যে অধ্যাদেশগুলো মানুষের জন্য কল্যাণকর, সেগুলো তারা অনুমোদন করছে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কেন ক্ষমতাসীনদের অনীহা, তা বোধগম্য নয়। তিনি আরও যোগ করেন, এটি মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারে সরকারের অনীহার প্রকাশ বলে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পরবর্তী সময়ে নতুন বিল আনা হবে। গুম প্রতিরোধ, দুদক শক্তিশালীকরণ এবং মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও সংশোধনীসহ নতুন বিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা হয়তো এ অধিবেশনে না হলে আগামী অধিবেশনে উত্থাপিত হতে পারে।
সর্বোপরি, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার অধ্যাদেশগুলোর অনুমোদন না পাওয়ায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার কবে নাগাদ এবং কতটা শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পালন করে।



