দুদকের মামলা: অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামে অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন নগর পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) কামরুল হাসান ও তাঁর স্ত্রী সায়মা হাসান।
মামলা দায়ের ও তদন্তের প্রক্রিয়া
বুধবার সন্ধ্যায় দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম মামলা দুটি দায়ের করেন। দুদক চট্টগ্রামের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের আরও সম্পদ রয়েছে কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।"
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কামরুল হাসানের নামে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী এলাকায় একটি বাড়ি এবং খুলশী এলাকায় ডিআইজি কার্যালয়ের পাশে ২ হাজার ৫৭০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। ফ্ল্যাটটি থেকে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ভাড়া পান তিনি। এ ছাড়া অনন্যা আবাসিক এলাকায় একটি প্লট রয়েছে। ঢাকার সাভারে ‘সাভার সিটি সেন্টার’ ও ‘সাভার সিটি টাওয়ার’ নামের দুটি মার্কেটেও তাঁর মালিকানা রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
অভিযোগের পটভূমি ও পূর্ববর্তী ঘটনা
‘আসামির খাবারের টাকা পুলিশের পকেটে’ শিরোনামে ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনে আসামিদের খাবারের বরাদ্দ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর চট্টগ্রাম আদালতের হাজতখানায় আসামিদের জন্য সরকারি খরচে খাবার সরবরাহ চালু করা হয়।
পরবর্তী সময়ে দুদক কামরুল হাসানের সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ হস্তান্তর রোধে আদালতে ক্রোকের আবেদন করে দুদক। আদালত তা মঞ্জুর করেন।
কর্মকর্তার ক্যারিয়ার ও অভিযোগের বিস্তারিত
দুদক সূত্রে জানা গেছে, কামরুল হাসান ১৯৮৯ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে হাটহাজারী ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) পদে কর্মরত অবস্থায় তাঁকে বদলি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি চট্টগ্রাম আদালতের হাজতখানায় আসামিদের জন্য সরকারি বরাদ্দের খাবার সরবরাহ না করে সেই খাতে বিল তুলে নিতেন। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও এসব সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি কোনো অনুমতি নেননি বলে অভিযোগ। এমনকি চট্টগ্রাম নগরে বাড়ি থাকার তথ্য গোপন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) থেকে অনন্যা আবাসিক এলাকায় প্লট বরাদ্দ নেন তিনি।
স্ত্রীর সম্পদ ও মোট অবৈধ সম্পদের পরিমাণ
দুদকের অনুসন্ধানে কামরুল হাসানের নামে ১৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার এবং তাঁর স্ত্রী সায়মা হাসানের নামে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সায়মা হাসানের নামেও চারটি নৌযান রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
এ ঘটনায় দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। তাঁদের নামে আরও কোনো সম্পদ রয়েছে কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে জানিয়েছে দুদক। এই মামলাগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



