ইভিএম প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার লুটপাট: পরিকল্পিত দুর্নীতির নকশা উন্মোচন
ইভিএম প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও দুর্নীতি

ইভিএম প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার লুটপাট: পরিকল্পিত দুর্নীতির নকশা উন্মোচন

একটি দেশের নির্বাচনব্যবস্থার ভিত্তি হলো জনগণের বিশ্বাস, রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক নীতিমালা। এই ভিত্তি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে শুধু নির্বাচনই নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই ধ্বংসের মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন উন্নয়ন ও আধুনিকতার নামে সেই ব্যবস্থার অভ্যন্তরেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয়ের আস্তানা গড়ে ওঠে। এটি আর সাধারণ ব্যর্থতা থাকে না; বরং পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতায় রূপ নেয়, যেখানে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ক্ষমতাবানদের সুবিধার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হয়।

ইভিএম প্রকল্প: বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্পটি বর্তমানে এমনই এক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যেখানে প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও পরিকল্পিত লুটপাটের চিত্র। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গৃহীত এই প্রকল্পটি প্রথমে উপস্থাপন করা হয়েছিল নির্বাচন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, দ্রুত ও কারচুপিমুক্ত করার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটির আর্থিক কাঠামো, ক্রয়পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত মান ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো এখন বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অনিয়মের চিত্র তুলে ধরছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, প্রায় দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কেনার জন্য প্রায় তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে এই মেশিনগুলো কেনা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রায় তিন হাজার ১৭২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুলের ফল নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগই এখানে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্রয়প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার অভাব

এই প্রকল্পের আরেকটি বড় প্রশ্নবিদ্ধ দিক হলো ক্রয়প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের বৃহৎ প্রযুক্তিগত প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এখানে দেখা গেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি পদ্ধতিতে ক্রয় সম্পন্ন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়েছে বিদেশ থেকে। অর্থাৎ, ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামো’ ব্যবহার করে একটি অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক লেনদেনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার নীতির পরিপন্থী।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি সামনে আসে যখন এই প্রকল্পের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতাধর ব্যক্তি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমদ সিদ্দিক, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ—এই প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি কোনো সাধারণ দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং এটি একটি “প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধ”, যেখানে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর, নীতিনির্ধারণী মহল ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে এক ধরনের সমন্বিত যোগসাজশ কাজ করেছে।

প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট অনেকেই নীরব থেকেছেন বা দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এই নীরবতা নিজেই এক ধরনের স্বীকারোক্তির ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে সত্য চাপা পড়ে থাকে প্রভাব ও ক্ষমতার ভারে। প্রকল্প গ্রহণের আগেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত করার অভিযোগ এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকল্পটি কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল ছিল না; বরং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত আর্থিক সুবিধা বণ্টনের একটি ছক। অর্থাৎ, জনগণের করের টাকা এখানে উন্নয়নের জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগবাটোয়ারার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে—এমন ধারণা মোটেও অমূলক নয়।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ইভিএম প্রকল্পটি প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা মেশিনের একটি বড় অংশ এখন অচল। দেড় লাখ মেশিনের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার ব্যবহারযোগ্য। তার মানে হল প্রকল্পটি কার্যত “ডিজিটাল আবর্জনা”তে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযানে প্রতি তিনটি মেশিনের একটি ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া যাওয়ার তথ্য শুধু নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের প্রমাণই নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের জিনিস উচ্চমূল্যে কেনার একটি ক্লাসিক উদাহরণ। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে যায় যে, এই নিম্নমানের মেশিনগুলো কি কেবল অব্যবস্থাপনার ফল, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছিল, যাতে কমিশনভিত্তিক লাভের সুযোগ তৈরি হয়?

কারণ, যখন একটি প্রকল্পে অস্বাভাবিক দামে ক্রয়, টেন্ডারবিহীন চুক্তি, নিম্নমানের সরঞ্জাম ও সীমিত জবাবদিহিতা একসঙ্গে উপস্থিত থাকে, তখন সেটিকে আর “ত্রুটি” বলা যায় না; সেটি হয়ে ওঠে সুস্পষ্ট ‘দুর্নীতির নকশা’। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবও এই প্রকল্পের ব্যর্থতার আরেকটি বড় কারণ। ১০ বছরের ওয়ারেন্টির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত। এতে স্পষ্ট হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের লক্ষ্য টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা ছিল না; বরং এটি ছিল দ্রুত ক্রয়, দ্রুত বিল ও দ্রুত লাভ নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যতের করণীয়

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই পুরো ঘটনাকে আরও জটিল করে তোলে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা উপেক্ষা করে ২০১৮ সালের বহুল বিতর্কিত নির্বাচনের ঠিক আগে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এটি কেবল প্রশাসনিক তড়িঘড়ি নয়; বরং একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয়। প্রযুক্তির আড়ালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করাই ছিল এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত এই প্রকল্পের ব্যর্থতার একটি নীরব স্বীকৃতি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশও একই বার্তা দেয়—এই প্রকল্প ছিল ভুল পথে হাঁটার একটি উদাহরণ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভুলের দায় কে নেবে? জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি প্রকল্পে যদি হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শুধু প্রশাসনিক ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কঠোর, নিরপেক্ষ ও সর্বাত্মক তদন্ত। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযান সেই প্রক্রিয়ার একটি সূচনা হতে পারে, কিন্তু সেটিকে শেষ পর্যন্ত কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো—এই প্রকল্পে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক অবস্থান—কোনো কিছুই যেন বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে।

কারণ, যদি এই ধরনের বিশাল দুর্নীতি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া থেকে যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে একই ধরনের অনিয়ম ঘটার ঝুঁকি থেকেই যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে—৩ হাজার কোটি টাকা কার পকেটে গেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা শুধু একটি আর্থিক হিসাবের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। সুতরাং ইভিএম প্রকল্পের লুটপাটকারীদের মুখোশ উন্মোচন ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী।