দুদকের ১২ হাজার মামলা ঝুলে আছে আদালতে, নিষ্পত্তির হার নগণ্য
দুদকের ১২ হাজার মামলা ঝুলে আছে, নিষ্পত্তি কম

দুদকের প্রায় ১২ হাজার মামলা আদালতে ঝুলে আছে, নিষ্পত্তির হার নগণ্য

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা প্রায় ১২ হাজার মামলা দেশের বিভিন্ন আদালতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। নিয়মিত শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ সত্ত্বেও মামলা নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম বলে জানা গেছে। ফলে প্রতি বছর শেষে নিষ্পত্তির চেয়ে নতুন মামলা যুক্ত হয়ে মোট মামলার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

মামলার বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও অবস্থান

দুদক ও আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মোট ১১ হাজার ৭৫৩টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে অধস্তন বা বিচারিক আদালতে রয়েছে ৬ হাজার ৪৬১টি মামলা, হাইকোর্টে ৪ হাজার ৯৫টি এবং আপিল বিভাগে ৭৪৫টি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় আছে। এছাড়া উচ্চ আদালতের আদেশে ৪১৯টি মামলা স্থগিত রয়েছে, যা মামলার দীর্ঘসূত্রতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

মামলার ধরন ও অভিযুক্তদের পরিচয়

দুদকের মামলাগুলোর বেশিরভাগ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, আয়কর ফাঁকি, সম্পদের তথ্য গোপন বা গরমিল, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অর্থপাচার সংক্রান্ত অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা, যা দুর্নীতির বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ ও আইনি জটিলতা

মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তরা বিচারিক আদালতের পাশাপাশি উচ্চ আদালতে আইনি প্রতিকার চান। অনেক ক্ষেত্রে দুদকের নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হয়, ফলে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই আইনি জটিলতাগুলো মামলা নিষ্পত্তির গতি কমিয়ে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

দুদকের আইনজীবী প্যানেল ও নেতৃত্বশূন্যতা

দুদক সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুদকের হয়ে মামলা পরিচালনার জন্য ১৩৫ জন আইনজীবীর একটি প্যানেল ছিল। তবে কাজের মান ও উপস্থিতির ঘাটতির কারণে নতুন প্যানেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তনের কারণে সেই প্রক্রিয়া থমকে আছে। এদিকে, গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করায় কমিশন বর্তমানে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে, যা মামলা পরিচালনায় আরও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমান আইনজীবী ব্যবস্থা ও মামলা নিষ্পত্তির হার

এর আগে, গত বছরের ১৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী ড. শাহদীন মালিককে কেইস-টু-কেইস ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার সঙ্গে অস্থায়ীভাবে আরও ৫৩ জন আইনজীবী কাজ করছেন। দুদকের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে ঢাকায় ৮৬৫টি এবং ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৯৩৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ২৪৮টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে। চলতি সময়ে সারাদেশে মাত্র ৩৩টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, যা নিষ্পত্তির নগণ্য হার নির্দেশ করে।

পুরনো মামলা ও সম্পদ জব্দের তথ্য

এছাড়া, ২২ বছর আগে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলের ৩৩৫টি মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি নিষ্পত্তি হয়েছে, যা পুরনো মামলাগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তুলে ধরে। দুদক কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে থাকা ৮ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৩১৩ টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে থাকা ২ হাজার ২১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৩ টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর আগে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ হাজার ৮৪৬ কোটি ৮২ লাখ ১৭ হাজার ৯৬৩ টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়, যা দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের কিছু ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে।

দুদকের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

এ বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, “দুদকের মামলাগুলোতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের অনুকূলে অর্থ আদায় একটি ইতিবাচক দিক। তবে বিচারাধীন মামলার বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে। দুদকের প্রসিকিউশন টিম মামলার নিষ্পত্তিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।” তার এই বক্তব্য মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের ওপর নির্ভরশীল হলেও দুদকের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।