পেকুয়ায় দুই শিক্ষকের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত শুরু, স্কুল ফান্ডে ৩১ লাখ টাকা আত্মসাৎ
কক্সবাজারের পেকুয়া সরকারি মডেল জিএমসি ইনস্টিটিউশনের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিন ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুল হোছাইনের বিরুদ্ধে স্কুল ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ, অনুমোদনহীন ছাত্র ভর্তি, পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের পরবর্তী শ্রেণিতে প্রমোশন, স্কুলের আইসিটি ল্যাব অচল রাখার অভিযোগসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রথম দফা শুনানি শেষ হয়েছে এবং ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটিকে ম্যানেজ করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন তারা বলে জানা গেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রক্রিয়া
গত ২৫ জানুয়ারি কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) তাসনীম জাহানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে জেলা শিক্ষা অফিসারকে আহবায়ক, শিক্ষা ও কল্যাণ শাখার সহকারী কমিশনার, শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলীকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি দুর্নীতির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে এবং প্রাথমিক শুনানি সম্পন্ন হয়েছে।
স্কুলের ঐতিহ্য বনাম বর্তমান সংকট
১৯২৯ সালে যাত্রা শুরু করা পেকুয়া জিএমসি ইনস্টিটিউশন পেকুয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। কক্সবাজার জেলায় কয়েকটি সুনামধন্য স্কুলের মধ্যে জিএমসি ছিলো একটি, যার পেছনে সাবেক প্রধান শিক্ষক এ এম এম শাহাজাহান চৌধুরীর অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিন ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুল হোছাইন ২০১৭ সালে নিয়োগ পাওয়ার পর স্কুলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ছাত্র আন্দোলন ও পদক্ষেপ
৫ই আগস্টের পর স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা এই দুইজনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তখন স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও পেকুয়ার সাবেক ইউএনও মাঈনুল হোসেন চৌধুরী তাদের সাময়িক অব্যহতি দেন। অব্যহতি অবস্থায় প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিনের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি অবসরে চলে যান। তবে ইউএনও মাঈনুল হোসেন চৌধুরী বদলি হওয়ার পর সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুল হোছাইন পুনরায় স্কুলে যোগদান করেন, যাকে এসব দুর্নীতির হিসাব মেলানোর মহা কারিগর হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
অডিট প্রতিবেদনে আর্থিক অনিয়ম
২০২২ সালের এক অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালে স্কুলের আভ্যন্তরীন আর্থিক হিসাব নিরীক্ষার জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) উলফাত জাহান এবং জিএমসির সিনিয়র শিক্ষক নুর মোহাম্মদ ও অরিন্দম দেব নাথ। তারা ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত স্কুলের অর্থিক হিসাব মেলাতে গিয়ে ৩১ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকার হিসাব পায়নি। ২০২২ সালে জমা দেওয়া অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে টাকাগুলো চেক ইস্যু বিহীন খরচ করা হয়েছে। সেই থেকে বছর পর বছর অডিট চললেও স্কুল ফান্ডের আত্মসাৎ হওয়া এই টাকাগুলো উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান অবস্থা
স্কুলের সহকারী শিক্ষক নুরুল হোছাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে বক্তব্য দিতে রাজি হননি এবং সাক্ষাতে বসে আলাপ হবে বলে এ প্রতিবেদকের মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা (ভারপ্রাপ্ত) জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর ইউএনও যে রিপোর্ট দিয়েছেন, ওই রিপোর্ট জেলা প্রশাসক বরাবর পুনরায় তদন্তের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং ফলাফল আশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা শিক্ষা খাতে দুর্নীতির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে স্থানীয় পর্যায় থেকে।
