বেবিচকে লাইব্রেরিয়ান থেকে ফ্লাইট ইন্সপেক্টর: যাত্রী নিরাপত্তায় মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিরুদ্ধে যাত্রী নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুসারে, উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ও পাইলট লাইসেন্স ছাড়াই এক লাইব্রেরিয়ানকে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর (এফওআই) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই পদটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অভিজ্ঞ পাইলট হওয়া বাধ্যতামূলক।
আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী পদায়ন
এই পদায়ন শুধু বেবিচকের নিজস্ব বিধিমালাই নয়, আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও)-এর নীতিমালারও পরিপন্থী। নিয়ম অনুযায়ী, একজন এফওআইকে হতে হবে বৈধ লাইসেন্সধারী পাইলট এবং তার অন্তত ৫ হাজার ঘণ্টা আকাশে উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর কাজী ফৌজিয়া নাহারের এই দুটি যোগ্যতার কোনোটিই নেই বলে যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অযোগ্য ও বিতর্কিত পদায়ন শুধু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘনই নয়, দেশের আকাশপথকেও পরিকল্পিতভাবে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বলেন, "একজন লাইব্রেরিয়ান কীভাবে এফওআই পদে পদোন্নতি পেলেন, তা আমার বোধগম্য নয়। এটা একেবারেই অযৌক্তিক। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এফওআই হতে হলে অবশ্যই পাইলট হতে হবে।"
কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সদস্য দাবি করেন, বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে ইন-হাউস প্রোগ্রামের মাধ্যমে কিছু নিয়োগ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, "কাজী ফৌজিয়া নাহার এফওআই পদে নিয়োগ পেলেও বর্তমানে মূলত কেবিন সেফটি ইন্সপেক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সময় বাড়িয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে।"
তবে বেবিচকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, বিদ্যমান বিধান এফওআই পদে নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, বয়সসীমা ও অভিজ্ঞতার কথা বলেছে। হঠাৎ করেই এগুলো সংশোধন করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আইকাও-এর মানদণ্ড উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, "যিনি নিজে উড়োজাহাজ পরিচালনায় অভিজ্ঞ নন, তার পক্ষে পাইলটদের দক্ষতা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।"
ফৌজিয়া নাহারের পটভূমি
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কাজী ফৌজিয়া নাহার ১৯৯৭ সালে বেবিচকে লাইব্রেরিয়ান পদে পোষ্য কোটায় যোগদান করেন। এটি একটি ‘ক্লোজড পোস্ট’, যেখানে চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির সুযোগ নেই। তার এভিয়েশন সম্পর্কিত কোনো বৈধ লাইসেন্স, ফ্লাইট ট্রেনিং কিংবা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা নেই। তা সত্ত্বেও ২০২১ সালে তাকে এফওআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
বিধিমালা অনুযায়ী, এফওআই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারিত। অথচ ২০২১ সালে পদায়নের সময় কাজী ফৌজিয়া নাহারের বয়স ছিল ৪৯ বছরের বেশি। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা আইকাও-এর নির্দেশনায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কেবল অভিজ্ঞ পাইলটদের সরাসরি নিয়োগের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, "এফওআই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কারিগরি পদ। এই পদে দায়িত্ব পালনের জন্য বৈধ পাইলট লাইসেন্স এবং উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। এ ধরনের পদায়ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইকাও অডিটে বিষয়টি উঠে এলে ফ্লাইট সেফটি রেটিং ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অনুমোদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।"
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক এ ধরনের নিয়োগকে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, "প্রবিধানমালা পরিবর্তন, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অনুমোদনের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, সবাই সমানভাবে দায়ী। এই নিয়োগ যথাযথ হয়নি প্রমাণিত হলে অবশ্যই বাতিল করা উচিত।"
ফৌজিয়া নাহারের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই
যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনিয়মের মাধ্যমে লাইব্রেরিয়ান পদ থেকে এফওআই হিসাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কাজী ফৌজিয়া নাহারের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কোনো কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হলেও সেখানেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
এই ঘটনা দেশের এভিয়েশন সেক্টরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করছেন বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
