রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকার দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ
রামেবি প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকার দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকার দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) স্থাপন প্রকল্পের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের চারটি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দরপত্রসমূহ বাতিল এবং দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি (টেক) পুনর্গঠনের দাবিতে সংক্ষুব্ধ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাবাস্সুম এন্টারপ্রাইজের স্বত্ব্বাধিকারী আব্দুল হান্নান গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ

অভিযোগের অনুলিপি দিয়েছেন রামেবির উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার ও দুর্নীতি দমন কমিশন, রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালককে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পের অধীনে সম্প্রতি চারটি দরপত্র ইজিপি মাধ্যমে আহ্বান করা হয়, যার নম্বর ১১৬৫৩৭৪, ১১৬৫৪৮৫, ১২১২২৬০ ও ১২০৮৪৪৩। উক্ত কাজসমূহ মূল্যায়নের লক্ষ্যে টেক নামে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়।

আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, উক্ত মূল্যায়ন কমিটিতে একই প্রকল্পে ক্রয় পরামর্শক রেজাত হোসেন রিটুকে সদস্য করা হয়েছে, যা পিপিআর ২০২৫ এর ১১(৫) বিধি পরিপন্থি। বিধি অনুযায়ী কেবলমাত্র সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হতে পারবেন। রেজাত হোসেন রিটু রামেবির কোনো কর্মকর্তা নন। তিনি প্রকল্পের একজন বহিরাগত চুক্তিভিত্তিক পরামর্শক মাত্র। তাই বিধি মোতাবেক তিনি কোনোভাবেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হতে পারেন না।

স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও নৈতিকতা সংক্রান্ত প্রশ্ন

আবেদনে বলা হয়, ‘পিপিআর-২০০৮ এবং পিপিআর-২০২৫ এ দরপত্র প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিহার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু মূল্যায়ন কমিটিতে প্রকল্পের ক্রয় পরামর্শক সদস্য হলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে যায়। কারণ, ক্রয় পরামর্শক প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ, যেমন—দরপত্র প্রস্তুত, টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন, প্রাক্কলন/কষ্ট এস্টিমেট প্রস্তুত, দরপত্র প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ক্রয় পরামর্শক সংশ্লিষ্ট থাকেন।’

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যের নৈতিক মানদণ্ড অত্যন্ত উচ্চ হওয়া আবশ্যক। সদস্যকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতমুক্ত থেকে শুধুমাত্র দরপত্র দলিলে উল্লিখিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো প্রকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আর্থিক স্বার্থ, প্রশাসনিক চাপ বা বাহ্যিক প্রভাব যেন তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে, সে বিষয়ে তাকে সচেতন ও দৃঢ় থাকতে হবে এবং সদস্যকে দুর্নীতি মুক্ত থাকতে হবে। কিন্তু প্রকল্পের ক্রয় পরামর্শক রেজাত হোসেনের বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির অভিযোগ চলমান রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়কে প্রভাবিত করার অনেক অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তাকে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে রাখার অর্থ দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া।

দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ

রামেবির আহ্বানকৃত দরপত্রসমূহের সম্মিলিত অর্থ প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। এতবড় অর্থের দরপত্র মূল্যায়নে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সদস্য রেখে দরপত্রের স্বচ্ছতাকে সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এতে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।’ এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে গঠিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পুনর্গঠন এবং দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের অনুরোধ করেছেন।

কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডা. হাসিবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘ট্রেন্ডারগুলো যে প্রকল্পের সেই প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) উপাচার্য নিজেই। ঐসব টেন্ডারের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাই আমি কোনো মন্তব্য করতেও পারবো না।’

মতামতের জন্য রামেবির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের ব্যক্তিগত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল নম্বরে অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।