চট্টগ্রামে পরিবহণ খাতে ১৬ বছরে ১৪০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ
চট্টগ্রামে পরিবহণ খাত থেকে একটি চক্র বিগত ১৬ বছরে চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে একটি মামলায় অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের করা এই মামলায় বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যা রীতিমতো বিস্ময়কর।
মামলার প্রধান আসামি ও তদন্তের গতি
মামলায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ও সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল। এছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি মোহাম্মদ মুছাসহ ৭২ জন এবং অজ্ঞাতনামা ১২০ থেকে ১৩০ জনসহ মোট ২০২ জনকে আসামি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়ের করা হলেও মাসের পর মাস পুলিশ তদন্তে কোনো ভূমিকা রাখেনি এবং আসামিদের কাউকে গ্রেফতার করেনি। বরং মামলা তুলে নিতে চাঁদাবাজরা বাদী শাহজাহানকে হুমকি-ধমকি ও চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।
বাদীর আপসনামা ও চাঁদাবাজির অব্যাহত অবস্থা
ফেডারেশন দখলে নেওয়া নতুন নেতাদের চাপ নিতে না পেরে বাদী তিন মাস আগে আদালতে আপসনামা দিয়ে মামলাটি তুলে নেন। এতে পরিবহণ চাঁদাবাজরা তাদের রাজত্ব বহাল রাখে এবং মাঠ পর্যায়ে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ পুরোনো মাফিয়াদের হাতেই থেকে যায়।
সরকারের পট-পরিবর্তন হলেও কেন্দ্রীয় ফেডারেশন দখল করা বিএনপিপন্থি শ্রমিক দলের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়। আগে আওয়ামী লীগপন্থি নেতাদের হাতে চাঁদার বড় অংক পৌঁছলেও নতুন করে সেই টাকার ভাগ নতুন নেতাদের হাতে পৌঁছতে শুরু করে, ফলে মাঠ পর্যায়ে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রীর বক্তব্য ও শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া
১৯ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহণ ও যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া চাঁদা নয়; বাধ্য করা হলে চাঁদা’। তার এই মন্তব্য পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজিকে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করেন পরিবহণ শ্রমিকরা।
মামলার বাদী শাহ জাহান যুগান্তরকে বলেন, ‘মামলার এজাহারের সব অভিযোগ সত্য, কিন্তু তদন্ত শুরু হয়নি এবং আমাকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিল। আমার পরিবার আছে বলে মাফিয়াদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারব না ভেবে আপসনামা দিয়েছি।’
চাঁদাবাজির বিস্তারিত হিসাব
জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরে টেম্পো, বাস-মিনিবাস, হিউম্যান হলার, ম্যাক্সিমা, সিএনজি অটোরিকশা এবং আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় করা হয়। ১৬ বছরে মোট ১ হাজার ৩৮১ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করেছে পরিবহণ খাতের সিন্ডিকেট।
- টেম্পো: ২২টি রুট, ৫,২৯৬টি গাড়ি, দৈনিক ১৫০ টাকা, ১৬ বছরে ৪৫৭ কোটি ৫৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
- বাস-মিনিবাস: ১৮টি রুট, ১,৯৪১টি গাড়ি, দৈনিক ১৫০ টাকা, ১৬ বছরে ১৬৭ কোটি ৭০ লাখ ২৪ হাজার টাকা।
- হিউম্যান হলার: ১৮টি রুট, ১,৮৬৬টি গাড়ি, দৈনিক ২০০ টাকা, ১৬ বছরে ১৬৭ কোটি ৭০ লাখ ২৪ হাজার টাকা।
- ম্যাক্সিমা: ২,১০০টি গাড়ি, দৈনিক ৫০ টাকা, ১৬ বছরে ৬০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
- সিএনজি অটোরিকশা: ১৩,০০০টি গাড়ি, দৈনিক ১০ টাকা, ১৬ বছরে ৭৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
- আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড: দৈনিক ২ লাখ টাকা, ১৬ বছরে ১১৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।
চাঁদাবাজির শিকার ও প্রতিবাদ
বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই চাঁদা আদায় করে, কিন্তু শ্রমিকদের কল্যাণে এক কানাকড়িও ব্যয় করা হয়নি। করোনা মহামারির সময়ও শ্রমিকরা কোনো সহায়তা পাননি। র্যাব ও পুলিশের অভিযানে অনেকে ধরা পড়লেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তাদের বিচার হয়নি, বরং প্রতিবাদকারীরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন।
ফেডারেশন নেতার বক্তব্য
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পণ্য পরিবহণ মালিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারা হোসেন বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামে কোনো চাঁদা তোলা হয়নি বলে আমার জানা। মালিকরা সাংগঠনিক ফি দেন। সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠবে না।’
এই ঘটনা চট্টগ্রামের পরিবহণ খাতের দীর্ঘস্থায়ী চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে, যা নাগরিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
