পটুয়াখালীতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ, সভাপতিকে হত্যার হুমকি
পটুয়াখালীতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সভাপতিকে হত্যার হুমকি

পটুয়াখালীতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ, সভাপতিকে হত্যার হুমকি

পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায় চাঁদা প্রদান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এক নির্মাণ সামগ্রী মালিক সমিতির সভাপতিকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট বন্ধ করে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শুক্রবার সকালে উপজেলার কালাইয়া ধান হাট সেতুর পশ্চিম পাশে অবস্থিত দাসপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ঘটনার পটভূমি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, দাসপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন প্যাদার পুত্র মো. শান্ত প্যাদাসহ কয়েকজন ব্যক্তি নিয়মিতভাবে চাঁদা আদায় করছিলেন। কালাইয়া ধান হাট সেতু সংলগ্ন দাসপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মোট ৩২ জন ব্যবসায়ীর দোকান রয়েছে, যারা দাসপাড়া-কালাইয়া নির্মাণ সামগ্রী মালিক সমিতির আওতায় সংগঠিত।

এই ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রলার ও কার্গো জাহাজের মাধ্যমে ইট, সিমেন্ট, বালু, পাথরসহ নানা ধরনের নির্মাণ সামগ্রী এনে বিক্রি করেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০টি ট্রলার ও কার্গো এখানে আসে এবং প্রতিটি বাহনের জন্য ব্যবসায়ীদের এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা চাঁদা প্রদান করতে বাধ্য করা হতো।

চাঁদা বন্ধের সিদ্ধান্ত ও হুমকির ঘটনা

সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা জানান, গত বুধবার সন্ধ্যায় তারা একটি জরুরি সভা করে আর চাঁদা প্রদান না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে শান্ত প্যাদা বৃহস্পতিবার সকালে চাঁদা নিতে এলে সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এসময় শান্ত প্যাদা প্রকাশ্যে মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে মারধর করে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে থানায় এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলে শান্ত প্যাদা আরও বেশি রাগান্বিত হয়ে ওঠেন। সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'শান্তর কাছে সর্বদা অস্ত্র থাকে বলে আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। দ্রুততার সঙ্গে তার গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।'

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ

শুক্রবার ধর্মঘটের খবর পেয়ে বাউফল আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং দ্রুত ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে আশ্বাস প্রদান করেন।

সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, 'আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবেন। প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখেও আমি চাঁদাবাজমুক্ত বাউফল উপজেলা গড়ে তুলবো।'

তার এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট খুলতে রাজি হন এবং দুপুর ১২টার দিকে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেন।

বিএনপি নেতার বক্তব্য ও প্রশাসনের অবস্থান

অভিযুক্ত শান্ত প্যাদার বাবা ও বিএনপি নেতা সোহরাব হোসেন প্যাদা এক ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে দাসপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম চৌধুরীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকায় একটি জলমহল ক্রয় করেছেন এবং সেই কারণে শান্ত ট্রলার প্রতি মাত্র ২০০ টাকা করে নেয়, যা কোনো চাঁদাবাজি নয়।

তবে উপজেলা ভূমি কার্যালয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কালাইয়া ও দাসপাড়া খালের জলমহল ইজারা হিসেবে কাউকে দেওয়া হয়নি। বিএনপি নেতা আলী আজম চৌধুরীর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পটুয়াখালীর সহকারী পুলিশ সুপার (বাউফল সার্কেল) আরিফ মুহাম্মদ শাকুর জানান, 'সংসদ সদস্য মহোদয়ের সঙ্গে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

এই ঘটনা স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে এবং চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।