টিআইবির উদ্বেগ: চাঁদাবাজিকে 'সমঝোতা' বলায় মন্ত্রীর বক্তব্য দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের বিপরীত
চাঁদাবাজিকে সমঝোতা বলায় টিআইবির উদ্বেগ, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান

চাঁদাবাজিকে 'সমঝোতা' বলায় টিআইবির তীব্র প্রতিক্রিয়া

সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের চাঁদাবাজিকে সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন হিসেবে উল্লেখ করার বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি এই ধরনের দুর্নীতি সহায়ক অপচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীকে নিজ দল শুদ্ধীকরণে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ

শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি তাদের এই অবস্থান স্পষ্ট করে। এর আগে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছিলেন, 'সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।'

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, 'পরিবহনমন্ত্রী চাঁদাবাজির যে সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন, তা তিনিসহ মন্ত্রিপরিষদের প্রায় প্রতিটি সদস্য দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতিবিরোধী যে দৃঢ় অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।'

নির্বাচনী অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক

ইফতেখারুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, 'ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও সরকারপ্রধানের জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণ, যেখানে কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার মাত্র ৪৮ ঘণ্টাও অতিবাহিত না হতেই মন্ত্রীর পরিবহন খাতের ক্যানসার চাঁদাবাজির সুরক্ষাপ্রয়াসী এ মন্তব্য খুবই হতাশাজনক।' তিনি বলেন, এর মাধ্যমে পরিবহনমন্ত্রী তাঁর নিজ দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার ও সরকারপ্রধানের দুর্নীতিবিরোধী দৃঢ় অবস্থানকে বিব্রতকরভাবে অবমূল্যায়ন করেছেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মতে, মন্ত্রী যেভাবে সড়ক ও পরিবহন খাতের বিদ্যমান চাঁদা–সংস্কৃতিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যাসহ পক্ষাবলম্বন ও সমর্থন করেছেন, তাতে স্পষ্টতই তিনি চাঁদাবাজির মতো একটি অনৈতিক ও যোগসাজশের দুর্নীতিকে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করছেন। যার সরাসরি ভুক্তভোগী এ দেশের পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ, যাদের এ অবৈধতার বোঝা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বইতে হয়।

বৈধতার অজুহাত বিভ্রান্তিকর

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'শুধু তা–ই নয়, মালিক ও শ্রমিককল্যাণকে যেভাবে এখানে বৈধতার অজুহাত বা ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, তা শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়; বরং এ খাতে বিরাজমান দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যপূর্ণ ব্যবস্থাকে সুরক্ষাসহ চলমান রাখার অপতৎপরতার শামিল।'

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সড়কে চাঁদাবাজিকে সমঝোতার নামে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া হলে বিআরটিএ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, বিচার, পাসপোর্ট, ভূমি, প্রশাসন ইত্যাদি সেবার পাশাপাশি সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংক, বিদ্যুৎসহ অন্য সব খাতেও একই তত্ত্বের ধারাবাহিক প্রয়োগ ও প্রসার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান

টিআইবি এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীকে জোরালোভাবে আহ্বান জানিয়েছে যেন তিনি নিজ দলের শুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখেন। সংস্থাটির মতে, শুধুমাত্র কঠোর পদক্ষেপই পারে দেশের পরিবহন খাতসহ অন্যান্য সেক্টরে বিদ্যমান দুর্নীতির সংস্কৃতি দূর করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে।