দুদকের মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপ চেয়ারম্যানসহ ২৬ জন, ৫৭৫ কোটি টাকা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ মোট ২৬ জনের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি থেকে ৫৭৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ঋণ অনুমোদন ও আত্মসাতের বিবরণ
দুদকের বক্তব্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের নামে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি থেকে মোট ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকার ফান্ডেড এবং ৭৫০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড অংশ। তবে, বিতরণকৃত ৫৭৫ কোটি টাকা পরিশোধ না করে তা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
মামলার অন্য আসামিদের তালিকায় রয়েছেন:
- বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিয়াত সোবহান ও পরিচালক ময়নাল হোসাইন চৌধুরী।
- কোম্পানির চলতি হিসাবের সিগনেটরি মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মাদ মাহবুব হায়দার খান ও ক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মাদ রুহুল আমিন।
- ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক মনোয়ারা সিকদার, খলিলুর রহমান, পারভীন হক সিকদার, মোয়াজ্জেম হোসেন, রিক হক সিকদার, রন হক সিকদার, মো. আনোয়ার হোসেন ও এ কে এম এনামুল হক শামীম।
- সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ (সি এম আহমেদ)।
এছাড়াও, ব্যাংকের দিলকুশা শাখার সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. একরামুল হক, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. রাজুনুর রশীদ, সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও আমিরুল ইসলাম, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. এনায়েত উল্লাহ ও শারাফাত উল্ল্যা চৌধুরীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হচ্ছে।
দুদকের অভিযোগ ও তদন্ত প্রক্রিয়া
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে অপর্যাপ্ত জামানত, ফিক্সড ও ফ্লোটিং চার্জ এবং ফোর্টনাইট স্টক রিপোর্ট ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেছেন। ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধসক্ষমতা যাচাই করা হয়নি, অন্যান্য ব্যাংকের দায়-দেনা পর্যালোচনা করা হয়নি এবং কারখানা পরিদর্শন প্রতিবেদন ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুদক আরও উল্লেখ করেছে যে, ঋণের শর্ত অনুযায়ী কাস্টম, পোর্ট, পরিবহন, সিঅ্যান্ডএফ চার্জ, অফিস ও গুদাম চার্জ, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিজ্ঞাপন, প্রশাসনিক ও সাধারণ ব্যয় এবং এলসি-সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বরং, ঋণের ৫০৩ দশমিক ১২৫ কোটি টাকা বসুন্ধরা গ্রুপভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ট্রান্সফার ও অনলাইন ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা করা হয়েছে। পরে এই অর্থ বিভিন্ন বিল সমন্বয়, নগদ উত্তোলন এবং ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে।
দুদকের ভাষ্য অনুসারে, এভাবে অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা টাকার অবৈধ প্রকৃতি, উৎস ও মালিকানা গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনি পদক্ষেপ ও তদন্ত দল
দুদক জানিয়েছে, এ অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলা করা হবে। মামলার বাদী হবেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান ভূঁইয়া, যিনি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দলের সদস্য।
এ বিষয়ে একটি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল কাজ করছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। এই দলে দুদক, সিআইডি, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
