গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় গত শুক্রবার এক নারী, তাঁর তিন সন্তান ও তাঁর ভাইকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন শিশুর বাবা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। হত্যার পর তিনি তাঁর ভাইকে ফোন করে বলেন, ‘সবাইকে শেষ করে দিয়েছি। আমাকে আর খুঁজে পাবে না।’ পরে স্বজনেরা গিয়ে ঘর থেকে লাশ উদ্ধার করেন। হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে ওই ব্যক্তিকে দুই সন্তানকে নিয়ে বাসার পাশের একটি দোকান থেকে চিপস ও চকলেট কিনে দিতেও দেখা গেছে।
প্রশ্ন: কেন একজন বাবা নিজের সন্তান হত্যা করেন?
প্রতিবেশী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এই ঘটনা দেশের মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একজন বাবা কীভাবে এমন কাজ করতে পারে, আমরা বুঝতে পারছি না। এটা কেমন নৃশংসতা।’ সাধারণত বাবা সন্তানের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন। সেই বাবাই যখন নিজের সন্তানদের হত্যা করেন, তখন এই হত্যাকাণ্ড আইনের সীমারেখা ছাড়িয়ে মনস্তত্ত্বের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
হত্যার মনস্তত্ত্ব: ফ্রয়েডের তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা
বিখ্যাত মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানবমনের তিনটি স্তর ব্যাখ্যা করেছিলেন—ইড, ইগো ও সুপার ইগো। ইড মানুষের আদিম অংশ, যা তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষা ও রাগের জায়গা। ইগো বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে, আর সুপার ইগো নৈতিক বোধ জাগায়। দীর্ঘদিনের হতাশা, দাম্পত্য সংকট ও মানসিক চাপে ইগোর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাগ ও আবেগ আচরণে প্রভাব ফেলে।
মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ হেলাল উদ্দিন বলেন, হত্যাকাণ্ড সাধারণত দুই ধরনের: পরিকল্পিত (প্রিমেডিটেটেড) ও তাৎক্ষণিক আবেগ থেকে (ইমপালসিভ)। কাপাসিয়ার ঘটনা কোন ধরনের, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ জন্য ‘মেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট’ প্রয়োজন। কিছু মানসিক রোগ যেমন সাইকোসিস, সিজোফ্রেনিয়া বা মাদকনির্ভরতা সহিংস আচরণের কারণ হতে পারে, তবে তদন্ত ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
দাম্পত্য কলহ ও সহিংসতার ইতিহাস
স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির সঙ্গে স্ত্রীর দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। কারণ ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা। কয়েক মাস আগে স্ত্রীকে মারধরের ঘটনায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। পরে স্ত্রী ফিরে এসে বলেন, ‘তিনটা বাচ্চা নিয়ে আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।’ কিন্তু সম্পর্ক টিকেনি।
হত্যার পর ফোন করার মনস্তত্ত্ব
হত্যার পর ভাইকে ফোন করে নিজের অপরাধের কথা জানানোকে অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনার আগে ও পরে মানুষের মানসিক অবস্থা এক থাকে না। হত্যার পর অপরাধবোধ, আতঙ্ক বা মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে আবেগের অবনমন ঘটায়।’
সমাজ ও পরিবারের দায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘পারিবারিক সহিংসতা হঠাৎ করে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দাম্পত্য অশান্তি ও মানসিক চাপ ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।’ দেশে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ সীমিত। অর্থনৈতিক চাপ, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক টানাপোড়েন মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়।
অধ্যাপক হালিমের মতে, পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরপেক্ষ থেকে কাউন্সেলিং ও সহমর্মিতার জায়গা তৈরি করা জরুরি। তবে কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয় না। এটি মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের ভেতরের অশান্তি ও মানসিক সংকটকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।



