বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম) প্রদান নিয়ে ‘তীব্র অসন্তোষের’ কারণেই শেষ পর্যন্ত পদক প্রদান স্থগিত করা হয়েছে। এমন তথ্যই জানিয়েছেন পদক বঞ্চিতরা। বিষয়টি পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন। তবে অফিসিয়ালি এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা।
পদক প্রদান স্থগিতের পেছনের কারণ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের অন্যান্য প্রস্তুতির মধ্যে পদকপ্রাপ্তদের মহড়া সম্পন্ন, মঞ্চ প্রস্তুত, অতিথি তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের আগের দিন শনিবার (৯ মে) রাতে হঠাৎ পদক প্রদান স্থগিত করা হয়। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম পদক প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। এর আগে করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন কারণে আয়োজন সীমিত হলেও স্থগিত করা হয়নি।
পেশাগত কাজে দক্ষতা ও ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবার ১০৯ জন পুলিশ সদস্যের পদক পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাহিনীর ভেতর ও বাইরে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা
পদক প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিতের বিষয়ে শুরুতে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন না হওয়া এবং তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করার জন্য আপাতত পদক প্রদান স্থগিত করা হয়েছে। পদক প্রদানের জন্য সরকারি আদেশ (জিও) জারি বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দেশের বাইরে থাকায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
তবে রবিবার রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সদর দফতর থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে প্রশাসনিক এই ব্যাখ্যার আড়ালে অন্য কারণ রয়েছে কিনা— সেই প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তালিকা ঘিরে বিতর্ক
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, পদক তালিকা প্রকাশের পর থেকেই বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। অভিযোগ ওঠে, আগের সরকারের আমলে পদক পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার নাম আবারও তালিকায় এসেছে। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বা প্রভাবশালী সংযোগের অভিযোগ রয়েছে এমন কর্মকর্তারাও মনোনয়ন পেয়েছেন। বিতর্কিত অভিযান বা আলোচিত ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিছু কর্মকর্তার দাবি, মাঠপর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সদস্যদের পরিবর্তে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে পদক নেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।
ডিআইজি পদমর্যাদার একজন বঞ্চিত কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতীতে একাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করেও পদক তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। এবারও আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তালিকায় তার নাম জায়গা পায়নি।’
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ
কর্মকর্তাদের আলোচনায় পদকের বিষয়টি বড় আকার নেয় বলে জানা গেছে। পদক প্রত্যাশীদের অতীত ভূমিকা ও পেশাগত রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রশাসনের উচ্চপর্যায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পদক তালিকা নিয়ে প্রকাশ্য অসন্তোষ তৈরি হলে তা বাহিনীর মনোবল ও শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অনুষ্ঠান স্থগিত করে তালিকা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক ট্যাগ
পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদক দেওয়ার অভিযোগ বারবার উঠেছে। এতে পদকের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নতুন সরকারের আমলে প্রথম পুলিশ সপ্তাহ হওয়ায় প্রশাসন বিতর্ক এড়িয়ে একটি ‘পরিষ্কার বার্তা’ দিতে চাইছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পদক যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে পুরো বাহিনীর সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়। যাচাই-বাছাই বাড়ানো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হতে পারে।’
পদকপ্রাপ্ত হিসেবে মনোনীত ১০৯ কর্মকর্তা কয়েকদিন ধরে রাজারবাগে মহড়ায় অংশ নেন। শনিবার রাত পর্যন্ত কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিতের কারণ জানতেন না। পরে হঠাৎ সিদ্ধান্তের খবর জানানো হয়।
রবিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধানের হাত থেকে পদক নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন তারা। কিন্তু পুলিশ সপ্তাহকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নতুন সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকার এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদক প্রদান অনুষ্ঠান কবে হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট সময় জানায়নি পুলিশ সদর দফতর। সরকারের চাওয়া অনুযায়ী নতুন করে যাচাই-বাছাই শেষে বছরের যেকোনও সময় পদক দেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম) বাহিনীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। তাই এবারের স্থগিতাদেশ শুধু একটি অনুষ্ঠান বাতিল নয়, বরং পুলিশ বাহিনীর স্বচ্ছতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং পেশাগত সংস্কৃতি নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে।



