‘নামে নামে জমে টানে’ প্রবাদ বাক্যটির সত্যতা মিলেছে নারায়ণগঞ্জে। স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে নামের মিল থাকায় ফুফাতো শ্যালককে খুন করেছেন স্বামী। খুনের পর লাশ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি লেকে ফেলে দেন।
ঘটনার বিবরণ
৯ মাস আগে নারায়ণগঞ্জের বেইজ স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী মো. ইয়াছিন আরাফাত (১৭) হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর রহস্য উদঘাটন করেছে নারায়ণগঞ্জ পিবিআই। রোববার (১০ মে) সংস্থাটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন নারায়ণগঞ্জ পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ।
তিনি জানান, স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের সন্দেহ থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী মো. ইয়াছিন আরাফাতকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। অথচ ঘাতকের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল মো. ইয়াছিন আরাফাত নামের আরেক ছেলের। স্ত্রীর মোবাইলের ম্যাসেঞ্জারে স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক মো. ইয়াছিন আরাফাতের পাঠানো একটি শর্টম্যাসেজ দেখে ঘাতক স্বামী এ ধারণা নেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভাবতে থাকেন এই ইয়াছিন আরাফাত তারই ফুফাতো শ্যালক।
নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধার
পুলিশ সুপার জানান, নিহত ইয়াছিন আরাফাত নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে শহরের উত্তর চাষাঢ়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত বছরের ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন তার পরিবার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। এর দুই দিন পর ১৩ আগস্ট সকালে সিদ্ধিরগঞ্জের আশরাফ আলী অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের সামনে ডিএনডি লেক থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের মা আফরিনা নাসরিন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে দীর্ঘদিনেও ঘটনার রহস্য উদঘাটন কিংবা জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রেম, বিয়ে ও দূরত্ব
তদন্তে বেরিয়ে আসে, গ্রেফতার আসামি আজিম হোসাইনের সঙ্গে ২০১৭ সাল থেকে নুসরাত জাহান মিমের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০২০ সালে তারা বিয়ে করেন। তবে দাম্পত্য জীবনে কলহ ও পরকীয়া সন্দেহ নিয়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা আলাদা থাকতে শুরু করেন।
পুলিশ সুপার আরও জানান, আলাদা থাকার পরও মিমের সঙ্গে আজিমের যোগাযোগ ছিল। ঘটনার প্রায় এক মাস আগে আজিম স্ত্রী মিমের বাসায় গেলে তার মেসেঞ্জারে ‘ইয়াছিন আরাফাত’ নামের এক ব্যক্তির বার্তা দেখতে পান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ওই ব্যক্তিকে ব্লক করে দেন। পরে মিমের সঙ্গে এ নিয়ে তার ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে আজিম ধারণা করতে থাকেন তার শ্যালক ইয়াছিন আরাফাতের সঙ্গেই তার স্ত্রী পরকীয়া করছে। তবে মিম কখনো তাকে তার প্রেমিক ইয়াছিন আরাফাতের পরিচয় স্পষ্ট করেননি। এতে ফুফাতো শ্যালক ইয়াছিনকে স্ত্রীর প্রেমিক সন্দেহ করতে থাকেন আজিম।
হত্যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন
একপর্যায়ে এই সন্দেহ থেকেই আজিম তার বন্ধু ফয়সালকে নিয়ে ইয়াছিনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার দিন গত বছরের ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় ইয়াছিন বাসা থেকে বের হলে আগে থেকে ওতপেতে থাকা আজিম ও ফয়সাল তাকে কৌশলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে সিদ্ধিরগঞ্জের দিকে নিয়ে আসে। পরে আরও কয়েকজন সহযোগী সিএনজিতে ওঠে। একপর্যায়ে সিদ্ধিরগঞ্জের আশরাফ আলী ফিলিং স্টেশনের সামনে ডিএনডি লেকপাড় এলাকায় নিয়ে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে ইয়াছিনকে হত্যা করে ঘাতকরা। তার মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ ডিএনডি লেকে ফেলে দেয়।
গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়া
এ ঘটনায় মূল আসামিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন- স্ত্রী নুসরাত জাহান মিমের স্বামী সোনারগাঁয়ের বরাব এলাকার মো. আজিম হোসাইন (২৭), সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকার ফয়সাল (২৭) এবং রূপগঞ্জের মৈকুলী এলাকার নুসরাত জাহান মিম (২৪)।
পিবিআই জানায়, গত ৫ মে ঢাকার ডেমরা এলাকা থেকে মূল আসামি আজিম হোসাইনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ মে সকালে শনিরআখড়া এলাকা থেকে ফয়সালকে এবং সন্ধ্যায় রূপগঞ্জের বরাব এলাকা থেকে নুসরাত জাহান মিমকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় মিমের কাছ থেকে তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
পিবিআই আরও জানায়, গ্রেফতারের পর আজিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। অন্য দুই আসামিকেও আদালতে পাঠানো হলে তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
পিবিআই জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।



