সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার সুরাহা হয়নি দেড় দশকেও। বৃহস্পতিবার (৭ মে) ১২৬ বারের মতো পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। সেই সরকার ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও খুনিদের ধরতে পারেনি। ১১৩ বারের মতো পেছায় তদন্ত প্রতিবেদন। সর্বশেষ ২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সংসদে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, “সাগর-রুনির তদন্ত নিয়ে সময় বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয়।”
অপরদিকে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও এই মামলার কোনও কূলকিনারা করতে পারেনি। দেড় বছরে ১১ বার শুনানি হলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। প্রতিবেদন জমা না দিতে পারার গ্রহণযোগ্য কোনও ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি তারা।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ মামলার বিচার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে এক ধরনের প্রত্যাশার কথা বলছিলেন সাংবাদিকসহ রাজনৈতিক নেতারা। কারণ অতীতে দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকতে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদী বক্তব্য ও বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নেতারা। অথচ বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আড়াই মাসে এ মামলার প্রতিবেদন দুইবার পিছিয়েছে। আসলে কী আছে এ বহুল আলোচিত এই মামলার ভাগ্যে? বিএনপির আমলে শেষ পর্যন্ত এই হত্যা মামলার বিচার কি আলোর মুখ দেখবে? নাকি অতীতের মতো একই পথে হাঁটবে, এমন প্রশ্ন আবারও সামনে আসছে।
সাংবাদিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি মনে করি তদন্ত কর্মকর্তার ব্যর্থতায় বারবার প্রতিবেদন দাখিলের সময় পিছিয়েছে। তাই তদন্ত কর্মকর্তাকে পরিবর্তনের সময় এসেছে।”
তিনি বলেন, “এই মামলাটির বিচার দীর্ঘায়িত করার পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল। আশা করি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময় মামলাটির বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
১২৬ বার প্রতিবেদন পেছানোর কারণ কী?
প্রায় দেড় দশকে ১২৬ বার পিছিয়েছে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ। আগামী ১৮ জুন প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৬ মে) ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ধার্য দিন ছিল। তবে এদিন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের চার মেয়াদে ১১৩, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১১ ও বর্তমান সরকারের সময়ে ২ দফা বাড়ানো হয় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়।
এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বারবার পেছানো নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, প্রকৃত আসামিদের না খুঁজে অভিযুক্ত করা হয়েছে সন্দেহভাজনদের। তাই মামলার বিচার দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাগর-রুনি হত্যা মামলায় জড়িতরা সমাজের প্রভাবশালী। তাদের পরিচয় গত দুই সরকারই জানতো। বর্তমান সরকারেরও অজানা নয় বলে মনে করি। মূলত প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করতেই এ বিচার দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।”
ফিরে দেখা
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় এই সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি নৃশংসভাবে খুন হন। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ, ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় সে।
এ ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন—বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, রফিকুল ইসলাম, সাগর-রুনির বাসার দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের ‘বন্ধু’ তানভীর রহমান খান। এর মধ্যে তানভীর রহমান খান ও পলাশ রুদ্র পাল জামিনে আছেন। অন্যরা কারাগারে আছেন।
প্রথমে এ মামলা তদন্ত করছিল শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ। চার দিন পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর দায়িত্ব পায় র্যাব।
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট মামলাটির তদন্তভার র্যাব থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের অধীনে তদন্ত পরিচালনার নির্দেশ দেন। পরে ২৩ অক্টোবর সরকারের সিদ্ধান্তে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
বিএনপির প্রতিশ্রুতি, কী বলেছিলেন শীর্ষ নেতারা?
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অতীতে নানা সমালোচনা করেছিলেন বিএনপির নেতারা। তারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করেন।
২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাটে এক জনসভায় বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের দুর্নীতির অনেক গোপন তথ্য থাকায় তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৪ জুলাই বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ১১ নম্বর দফায় তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমতায় গেলে চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাসহ সব সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করবে তার দল।
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনে তিনি বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের একযুগ অতিক্রম হলেও বিচার না হওয়া উদ্বেগজনক। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সাগর-রুনি হত্যা মামলার সুষ্ঠু বিচার করা হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি দীর্ঘায়িত করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারও একই আচরণ করেছে। তবে বিএনপি যেহেতু অতীতে এই বিচার বাস্তবায়নের কথা বলেছে, তাই বর্তমান সরকার আইনিভাবেই তা সমাধান করবে বলে আমার বিশ্বাস।”



