রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রশিল্প: অজানা দিক ও বৈশিষ্ট্য
রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা: স্বশিক্ষিত প্রতিভার অনন্য প্রকাশ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রশিল্পী হিসাবে যথেষ্ট প্রতিভাধর ছিলেন। ৬৩ বছর বয়সে চিত্র আঁকা শুরু করেন তিনি। শেষ ১৭ বছরে আড়াই হাজারের বেশি চিত্রকর্ম রচনা করেন। তাঁর প্রথম চিত্রকর্ম ১৯২৮ সালে। তখন থেকে স্বাধীন চিত্রকর্ম করতে শুরু করেন। তিনি স্বশিক্ষিত চিত্রশিল্পী ছিলেন। আধুনিক ও প্রকাশবাদী শৈলীতে নির্মিত তাঁর চিত্রকর্ম সৃজনশীলতা ও বহুরৈখিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

চিত্রকর্মের রূপ ও বৈশিষ্ট্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্মের বেশ কিছু রূপ বা ফর্ম রয়েছে। তাঁর চিত্রকর্মের মুখ (পোর্ট্রেট) অনন্য হয়েছে, যা বিষণ্নতা, রহস্যময় এবং রোমাঞ্চের অনুভূতি প্রকাশ করে। তাঁর চিত্রকর্মে ভারতীয় নারীর চিত্রায়ণ অনেকটা জুড়ে রয়েছে, এবং ভারতীয় নারীকে প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে তুলে ধরেছেন। ছন্দ ও গতি হলো দুটি মৌলিক ধারণা, যা সমসাময়িক চিত্রবিশ্বে আলোড়ন তোলে।

প্রভাব ও অনুপ্রেরণা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাথমিক শিল্প, ইউরোপীয় এক্সপ্রেশনিজম এবং জাপানি শিল্পের প্রতি অনুরাগ ছিলেন। তাঁর চিত্রকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হচ্ছে: আকারের বিকৃতি, রঙের অস্বাভাবিক ব্যবহার, রেখার সংবেদনশীল ব্যবহার ইত্যাদি। তাঁর চিত্রকর্মে সুরিয়ালিজমের গন্ধ পাওয়া যায়, তাঁর চিত্রে বিচিত্র অভিব্যক্তি লক্ষ করা যায়, যা সেসময়ে ভারতীয় চিত্রকর্মে খুব কমই লক্ষ করা যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নারী চিত্রায়ণ ও বৈচিত্র্য

বৈচিত্র্যবাদ শিল্পকর্মে প্রকাশিত হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উপজীব্য হিসাবে ব্যবহার করেছেন। অন্তর্দৃষ্টি তাঁর প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলির মধ্য দিয়ে স্বপ্নময় গীতিময় জগতের দিকে নিয়ে যায়। তাঁর চিত্রকর্ম মনস্তাত্ত্বিক তীব্রতা নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। তাঁর রেখাগুলি সহজ কিন্তু দৃষ্টি জটিল। মৌলিকতা ও সৃজনশীলতা দূরদৃষ্টির সমাহার। নারীর মুখ, মুখোশ কিংবা চরিত্রের চিত্রায়ণে (ভারতীয়/এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপীয়) দক্ষতার পরিচয় ও প্রকাশ দক্ষতা নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছাঁচভাঙা মনোভাব

ছাঁচভাঙা মনোভাব চিত্রকর্মে, বিশেষ করে নারী চিত্রকর্মে। বিপ্লবী মনোভাব ও প্রতীক বিরোধী প্রকৃতি সম্ভবত নারী চিত্রকর্মে স্পষ্ট। নারীচিত্রকর্মে অসীম বৈচিত্র্য—স্বপ্নময়, দারুণ সাহসী, একাকী ও বেদনার্ত, অলিঙ্গীয়, কিছু চিত্র খুবই রোমাঞ্চকর। ভারতীয় চিত্রের ফর্ম থেকে বেরিয়ে এসে বিপরীতমুখী এসব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। তাঁর নারীরা সবগুলোই তরুণ নয়, কিংবা সুন্দরীও নয়। কিন্তু অন্তর্নিহিত শক্তির আধার।

রঙ ও রেখার ব্যবহার

রবীন্দ্রচিত্রকলায় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, রেখাচিত্র ও বিভিন্ন রঙের ব্যবহার। খয়েরি রঙের ব্যবহার বেশি করা হয়েছে। তবে সবুজ ও নীল রঙের ব্যবহার নেই বললেই চলে। কালি ও কলমে আঁকা বেশ কিছু ছবি লিনিয়ার রেখায় ফুটে উঠেছে। তাঁর চিত্রকলায় অপরূপকে সন্ধানের কোনো আকুলতা নেই। আছে শুধু রূপকে অপরূপ করার সাধনা।

সৃজনশীলতার মাধ্যম

সৃজনশীলতা প্রকাশের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে তার মধ্যে চিত্রকর্ম একটি অন্যতম মাধ্যম। বৈষয়িক জীবনে রবি ঠাকুরের মনে যে ভাবাবেগ, আবেগ, উদ্দীপনা, হৃদয়-বেদনা, শক্তির উপলব্ধি ও সৌন্দর্যবোধের উদয় হতো তা তাঁর চিত্রে প্রতিফলিত হতো। চিত্রকলায় কবির প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও তিনি চিত্র অঙ্কনে ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

অনেকে ধরে নেন, রবীন্দ্রনাথ শুধু-শুধু বিনোদন কিংবা অবসর কাটানোর জন্য নয়, বাঙালির চিত্রশিল্পে গভীর ছাপ রাখতে যাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিনব ও অনবরত সৃষ্টিক্রিয়া এবং কল্পনার মিশেলে নতুন এক ঐকতান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধুমাত্র ভারতীয় রীতি অনুকরণ না করে ইউরোপীয় তেজস্বী প্রয়োগ করেছেন আবার প্রাচ্যের রীতির সংমিশ্রণ দিয়ে ভারতীয় চিত্রকলায় নতুন এক অধ্যায় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রদর্শনী ও প্রশংসা

ইউরোপীয় সমালোচকরা স্বীকার করে নেন যে, এক্সপ্রেশনিজম (প্রকাশবাদ) রবীন্দ্র-চিত্রকল্পে অনস্বীকার্য একটি বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্র চিত্রকলায় মানুষের যে আকৃতি আঁকা হয়েছে তা এ রীতিকেই অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথের চিত্রে রেখার প্রাধান্য রয়েছে। রং বিন্দুর সংযোগে তাঁর রেখা অন্যরকম মাত্রা পেয়েছে, নান্দনিক হয়েছে। তাঁর চিত্রের অভিব্যক্তি অনুধাবনযোগ্য।

শেষ বয়সের প্রিয়া

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের চিত্রকর্মকে ‘শেষ বয়সের প্রিয়া’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৯২৫ সালে ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপিত পাতায় পাতায় কাটাকুটি থেকেই চিত্রশিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু কিছুদিন যেতেই তাঁর প্রতিভার ঝলক লক্ষ্য করা যায়। অবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকার চিত্রশিল্পীদের প্রশংসা পেতে শুরু করেন। আগে যা কোনো এশীয় চিত্রশিল্পীর পক্ষে সম্ভবপর হয়নি।