সারা দেশে মাদকবিরোধী সমন্বিত অভিযান শুরু, তালিকায় ২৩ হাজার কারবারি
সারা দেশে মাদকবিরোধী সমন্বিত অভিযান শুরু, তালিকায় ২৩ হাজার

সারা দেশে মাদকের বিস্তার রোধ এবং মাদক কারবারি চক্র শনাক্ত ও গ্রেফতারে সমন্বিত অভিযান শুরু করেছে সরকার। শুক্রবার (১ মে) থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে অংশ নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি), পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে মাদক কারবারিদের একটি হালনাগাদ তালিকাও। এতে ২৩ হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম রয়েছে। তবে ঘোষণা দিয়ে অভিযান শুরু হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল মিলবে কিনা— এমন প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, কেবল খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা নয়, মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল আসবে না।

সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, এবারের অভিযানে মাদক কারবারে জড়িত প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিএনসির তালিকায় ২৩ হাজার ৩০০, পুলিশের তালিকায় প্রায় ১৯ হাজার এবং বিজিবির তালিকায় প্রায় তিন হাজার সন্দেহভাজন কারবারির নাম রয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক নোটিশের জবাবে তিনি বলেন, ''২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় অভিজাত এলাকায় মাদক কারবার বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডিতে সিসা বারের আড়ালে মাদক ব্যবসা চলার অভিযোগ রয়েছে।''

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মন্ত্রী জানান, এসবের বিরুদ্ধে এবার 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করা হবে। কোনও প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাদক কারবারে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনও প্রভাবশালী অনেক মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে তিন শতাধিক প্রভাবশালী কারবারির তথ্য পাওয়া গেছে। পাইকারি পর্যায়ের বিক্রেতার সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি। ঢাকা মহানগরীতেও মাদক কারবারির সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিশেষ করে কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্ত এলাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। টেকনাফের হোয়াইক্যং, শাহপরীর দ্বীপ ও সাবরাং এলাকায় রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে কিছু চক্রের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। কক্সবাজারেই শতাধিক মাদক গডফাদার শনাক্ত করা হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে প্রস্তুতি

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ উপ-অঞ্চলের উপ-পরিচালক রাজিউর রহমান জানান, সরকারের ঘোষণার পর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৩০ এপ্রিল রাতের মধ্যেই ডিএনসির সব ইউনিটে অভিযান সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্তত এক মাস অভিযান পরিচালিত হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশনস) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. বশির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান কার্যক্রমের অংশ। ইতোমধ্যে বহু গডফাদারকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলাও হয়েছে। সরকারের ঘোষণার পর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।''

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''মাদকবিরোধী অভিযান একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক উদ্ধার ও গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। তবে সরকারের নির্দেশনার পর অভিযান আরও জোরালোভাবে পরিচালিত হবে।''

তিনি বলেন, ''মাদকের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তি, পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জিরো টলারেন্স নীতিতেই অভিযান চলবে।''

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''মাদকবিরোধী অভিযানকে কার্যকর করতে হলে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তব প্রয়োগ জরুরি। তরুণ সমাজে মাদকের প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।'' তিনি বলেন, ''সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে কেবল বাহক নয়, সুবিধাদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, সরকারের ঘোষিত অভিযানের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।''