সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকার একটি আদালত তার নামে থাকা বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও ওয়েজ আর্নারস বন্ড জব্দের নির্দেশ দেওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
আদালতের নির্দেশনা
বুধবার (২৯ এপ্রিল) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৮৭টি এফডিআর হিসাব ফ্রিজ করার আদেশ দেন। এসব এফডিআরে মোট জমার পরিমাণ ২৭ কোটি ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১২১ টাকা। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৬৬ হাজার ৩৭৬ টাকা ও ১৬ হাজার ৪১৯ মার্কিন ডলার এবং এক কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ১৩টি ওয়েজ আর্নারস বন্ডও জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুদকের আবেদন
আদালত সূত্র জানায়, দুদকের উপসহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাবিকুন নাহার এ আবেদন করেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন। তদন্তে তার বিরুদ্ধে ৩৫ কোটি ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৭ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অর্থ লেনদেনের অসঙ্গতি
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজের নামে ও ছদ্মনামে পরিচালিত ১৫টি ব্যাংক হিসাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৯ কোটি ২১ লাখ ১৮ হাজার ৮৪২ টাকা এবং ১১ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৬ মার্কিন ডলারের লেনদেন করেছেন, যা তদন্তে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া ৭ কোটি ৭২ লাখ ১৮ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপনেরও অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এসব অভিযোগে গত বছরের ২ জুন একটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত চলমান থাকায় সম্পদ সরিয়ে ফেলার আশঙ্কায় আদালতের কাছে হিসাবগুলো জব্দের আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও বন্ড ফ্রিজের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী তার মোট ১০৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সম্পদ নজরদারিতে এসেছে।
রাজনৈতিক পটভূমি
একসময় ফরিদপুরের দুর্দান্ত প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। টানা ৩ মেয়াদে সংসদ সদস্য থাকা এই নেতা দীর্ঘ সময় ধরে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন।
তবে ২০২০ সালের পর থেকেই তার রাজনৈতিক অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়। ওই বছরের ৭ জুন ফরিদপুরে আলোচিত পুলিশি অভিযানে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী বরকত ও রুবেল গ্রেফতার হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। এর দুই দিন পর ৯ জুন তিনি ফরিদপুর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান।
দেশত্যাগ ও বর্তমান অবস্থান
এরপর খুব অল্প সময়ের জন্য ২০২০ সালের ১৪ জুলাই তিনি একদিনের জন্য ফরিদপুরে আসেন এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি খালার জানাজায় অংশ নিতে সেখানে যান। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি এক রাতের বেশি অবস্থান করেননি। পরে ২০২২ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যান বলে জানা যায়। বর্তমানে তিনি সেখানেই মেয়ের বাসায় অবস্থান করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এরপর থেকে দলের ভেতরেও ধীরে ধীরে তার প্রভাব কমতে থাকে। ডিসেম্বর ২০২২ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৩ সালের মে মাসে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য পদ থেকেও তিনি বাদ পড়েন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি কার্যত রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব
ফরিদপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে খন্দকার মোশাররফকে ঘিরে নানা আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি অত্যন্ত কর্তৃত্ববাদী আচরণ করতেন এবং বিরোধিতাকে সহ্য করতেন না। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, এমনকি নিজ দলের ভিন্নমতের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন সময় চাপ ও হয়রানির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে দুর্নীতির মামলা, সম্পদ জব্দ ও বিদেশ অবস্থান সব মিলিয়ে একসময়কার প্রভাবশালী এই নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।



