সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের নামে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ
সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থীদের নামে ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ছবি ও তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ‘আওয়ামী লীগের মমতাজ না থাকলে কী হবে, জামায়াতের জিন্স পড়া মমতাজ আসছে সংসদে…’—এমন ক্যাপশনে একটি ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয় ফেসবুকে। সেই ছবিতে দেখা যায়, মারদিয়া মমতাজ জিন্সের প্যান্ট পরে আছেন। অথচ ছবিটি ভুয়া।

ভুয়া ছবি ও বক্তব্য

মারদিয়া মমতাজ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী। তাঁর নামে ছড়ানো ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি বলে নিশ্চিত হয়েছে ফ্যাক্ট চেকাররা। রিভার্স ইমেজ সার্চে জিন্স পরা তাঁর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। এআই শনাক্তকারী টুল ‘হাইভ মডারেশন’ ও গুগলের ‘সিন্থআইডি’ টুলে ছবিটি এআই-নির্মিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

একইভাবে বিএনপির মনোনীত নারী প্রার্থী সুবর্ণা শিকদার ঠাকুরের নামে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনার অনুরোধেই আমাকে নারী এমপি বানিয়েছে বিএনপি।’ যাচাইয়ে দেখা যায়, এই মন্তব্য তিনি করেননি। ‘আশার আলো’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে তা ছড়ানো হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছোট পর্দার অভিনেত্রী ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী রুকাইয়া জাহান চমকের নামেও অপতথ্য ছড়ানো হয়। তিনি মনোনয়ন না পাওয়ার পর তাঁর নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে, ‘হাদি হত্যার বিচার চাওয়ায় শেষ মুহূর্তে এসে আমায় সংরক্ষিত আসনের এমপি তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে বিএনপি।’ যাচাইয়ে দেখা যায়, এই দাবির উৎস ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ।

মডেল ও আন্দোলনকর্মী ফারজানা সিঁথির নামেও ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো হয়, যেমন ‘১৭ বছর রাজপথে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করলাম, অথচ আমাকে এমপি করা হলো না’, কিংবা ‘বিএনপির মত একটা মূর্খ দলের থেকে মনোনয়ন চাওয়া আমার ভুল হইছে’। এসবের উৎস ‘গজব ভিশন’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ছবি ব্যবহার করে তাঁর নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হয়, ‘শিল্পা শেঠির মতো সান্নিধ্য পাওয়ার কথা ছিলো আমার অথচ ছক্কা মেরে দিলো চমক। আসলেই জুলাই আন্দোলন করা ভুল ছিলো।’

ছবি বিকৃত করে অপপ্রচার

বিএনপির মনোনীত নারী প্রার্থী মানসুরা আলমের একটি ছবি ছড়িয়ে দাবি করা হয়, তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে আছেন। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিতে থাকা ব্যক্তি সাদ্দাম হোসেন নন; তিনি লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক কাউন্সিলর প্রয়াত জুবায়ের কবির তুষার। মানসুরা আলম জানান, ছবিটি ২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে তোলা। তিনি বলেন, ‘তুষার ভাই প্রথম আলো বন্ধুসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে লেবাননে দূতাবাসে কাউন্সিলর ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ছবিটি পোস্ট করেছিলাম। পরে শিবিরকর্মী একজন তা সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে বলে প্রচার করেন, পরে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেও ততক্ষণে অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ে।’

তিন কৌশলে অপতথ্য

সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অপতথ্যগুলোতে তিনটি কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে: এআই দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ছবি, স্যাটায়ার কনটেন্টকে বাস্তব হিসেবে প্রচার, এবং ব্যক্তির নামে বানোয়াট মন্তব্য জুড়ে দেওয়া।

গভীরভাবে উদ্বেগজনক

রিউমর স্ক্যানারের সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার তানভীর মাহতাব আবির বলেন, ‘বিগত সময়ে আমরা দেখিয়েছি যে বাংলাদেশে নারী, বিশেষ করে যাঁরা অনলাইন স্পেসে আলোচনায় থাকেন, তাঁদের ঘিরে অপতথ্য প্রচার হরহামেশাই হয়ে থাকে, শেষ করে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়ও নারীরা তাই অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রবণতা শুধু বিচ্ছিন্ন অপপ্রচার নয়, বরং একটি কাঠামোগত ও লক্ষ্যভিত্তিক ডিজিটাল সহিংসতার পথ তৈরি করে দিচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে ভুয়া ছবি, এআই-নির্ভর কনটেন্ট ও বিকৃত বক্তব্য ছড়ানোর ফলে নারী প্রার্থীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’

ডিসমিসল্যাবের রিসার্চ অফিসার তৌহিদুল ইসলাম রাসো বলেন, ‘যখনই কোনো নির্বাচন বা রাজনৈতিক ইভেন্ট আসে এবং সেখানে নারী রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি থাকে, তখনই তাঁদের নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। ডাকসু নির্বাচনেও আমরা তা দেখেছি। সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়েও কিছু নজির বর্তমানে দেখা যাচ্ছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, এসব অপতথ্য ও নেতিবাচক প্রচারণা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলে, এবং নারীরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়তে পারেন।