বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের বৃহত্তর কৌশলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশে অর্থপাচার চিহ্নিত করে তাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জবাব
বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি সংসদে উপস্থাপন করেন। তার লিখিত বক্তব্যে তিনি বিশদভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এবং সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ দেন।
অবৈধ অর্থ প্রবাহের চাঞ্চল্যকর তথ্য
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে প্রকাশ করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল অঙ্কটি বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকার সমতুল্য। পাচারকৃত এই বিপুল অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চুক্তি প্রক্রিয়া
এই লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ [Mutual Legal Assistance Treaty (MLAT)] সম্পাদন এবং Mutual Legal Assistance Request (MLAR) বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশসমূহের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে:
- যুক্তরাষ্ট্র
- যুক্তরাজ্য
- কানাডা
- সুইজারল্যান্ড
- অস্ট্রেলিয়া
- থাইল্যান্ড
- সংযুক্ত আরব আমিরাত
- সিঙ্গাপুর
- মালয়েশিয়া
- হংকং-চায়না
এই দেশগুলোর মধ্যে তিন দেশ (মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে ইতিমধ্যে সম্মতি প্রদান করেছে। বাকি ৭টি দেশের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন।
বিশেষ টাস্কফোর্স ও তদন্ত দল গঠন
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেসসমূহের অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে মোট ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এই তদন্ত দল গঠনের পর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর অগ্রগতিও সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।
মামলা ও রায়ের বর্তমান অবস্থা
পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে। সরকার এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
নতুন বিভাগ গঠন
বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের অধীনে স্টলেন এ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন (Stolen Asset Recovery Division) গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষ বিভাগটি সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের বৃহত্তর কৌশলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম জোরদার করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।



