আওয়ামী লীগ আমলে বিপুল অর্থ পাচার: সরকারের পুনরুদ্ধার উদ্যোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত আনতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং একাধিক মামলা পরিচালনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের উনিশতম দিনে, বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকালে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সংসদে উত্থাপিত প্রশ্ন ও প্রধানমন্ত্রীর জবাব
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান একটি লিখিত প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন, “বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে বিভিন্ন উপায়ে বা প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। ওই টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা বা হবে কিনা?” প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জবাবে স্পষ্ট করে বলেন, “শেখ হাসিনা, তার সরকারের মন্ত্রী এবং অন্যান্য সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।”
টাস্কফোর্স গঠন ও মামলার বিস্তারিত
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মোট ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১ মামলায় যাদের নামে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের তালিকা নিম্নরূপ:
- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- এস আলম গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- বেক্সিমকো গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- সিকদার গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- বসুন্ধরা গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- নাসা গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- ওরিয়ন গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- নাবিল গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- এইচ বি এম ইকবাল, তার পরিবার ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
- সামিট গ্রুপ ও এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান
অর্থ পাচারের পরিমাণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
সরকার প্রধান উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাচারকৃত এই অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায়, তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ সম্পাদন এবং মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল এসিসটেন্ট রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে কাজ করছে। অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের মধ্যে তিনটি দেশ—মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। অপর সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মামলার অগ্রগতি ও সরকারের অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সার্বিকভাবে বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।”
এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে সরকার আশা করছে, আওয়ামী লীগ আমলে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।



