পঞ্চগড়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ, তদন্তে সত্যতা মেলেনি
পঞ্চগড়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ, তদন্তে সত্যতা মেলেনি

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে গত সোমবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুর পথ রোধ করে ‘ঘুষের টাকা’ ফেরত চান এক নারী। এ সময় নিজের ফেসবুক আইডি থেকে ঘটনাটি লাইভ করেন তিনি। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন রেহেনা বেগম (উর্মি) নামের ওই নারী। তিনি তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর ইউনিয়নের মাগুরা এলাকার বাসিন্দা।

অভিযোগের বিবরণ

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ছেলেকে গ্রাম পুলিশের চাকরি দেওয়ার কথা বলে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু ওই নারীর কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। সেই টাকা ফেরত চাইলে তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু দাবি করেছেন, তিনি ওই নারীকে চিনতেন না এবং ওই নারী কখনো তাঁর দপ্তরে আসেননি।

ফেসবুক লাইভের ভিডিও

৯ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ফেসবুক লাইভে দেখা যায়, নিজের কার্যালয়ের নিচে হেঁটে যাচ্ছিলেন ইউএনও। গাড়ির কাছাকাছি যেতেই ওই নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভ করতে করতে ইউএনওকে বলেন, ‘আপনি চাকরি দিতে চাইছেন, এখন মিথ্যা কথা বলিয়েন না।’ তখন ইউএনওর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন আনসার সদস্য এগিয়ে এলে ওই নারী বলেন, ‘আপনি ফোন নিচ্ছেন কেন? ফোন নিবেন না। নাইলে কিন্তু সমস্যা হবে, আমি গরিব লোক।’ এ সময় ইউএনও বলেন, ‘কত টাকা দিছেন?’ উত্তরেঃ ‘১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিছি আপনাকে।’ ইউএনও জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোন জায়গায় দিছেন?’ জবাবে ওই নারী বলেন, ‘আপনার অফিসে দিছি ছয় মাস আগে। তখন ডিসেম্বর মাস। তিন মাস আগেও তো আমি আপনার অফিসে আসছি স্যার, আপনি এ রকম কেন শুরু করছেন?’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এরপর ইউএনও বলেন, ‘আপনাকে তো আমি চিনি না। আপনার ছেলে কে? তাই তো চিনি না। আপনাকে সিনক্রিয়েট করতে পাঠায় দিল আর আপনি এসে নকশা করতেছেন এই জায়গায় এসে?’ তখন ওই নারী বলেন, ‘আমি আপনার সাথে নকশা করব কেন, বলেন। আপনি আমার টাকাটা দিয়ে দেন স্যার, আপনি আমাকে জেলে দেন, ফাঁসি দেন, যা-ই দেন, আমার টাকাটা লাগবে। আজকে আমি তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারি না, আপনি টেনেসফার (বদলি) হবেন।’ পরে অনেক কথাবার্তার পর ওই নারী পাশের একজনকে বলেন, ‘দেখত ভাইয়া লাইভটা হইছে না? এখন কাটব কেমনে বলেন? আমি এখন ডিসির কাছে যাব।’

মানববন্ধন ও প্রতিক্রিয়া

ঘটনাটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তেঁতুলিয়াসহ জেলাজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ইউএনওর পক্ষে মঙ্গলবার তেঁতুলিয়ায় দুই দফা মানববন্ধন করা হয়। বেলা ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ‘বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের’ ব্যানারে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে উপজেলা শহরের তেঁতুলতলায় ‘উপজেলার সর্বস্তরের জনসাধারণ’ ব্যানারে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধন থেকে ইউএনওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ এবং ওই নারীসহ ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

প্রতিবেশীদের বক্তব্য

মঙ্গলবার বিকেলে ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই নারী যে জমিতে বাড়ি করে আছেন, সেটি জেলা পরিষদের জায়গা। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি সেখানে এসে বাড়ি করেন। টিনের বেড়া দেওয়া ঘরে দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন। তাঁর এক ছেলের বয়স ২২ ও অন্যজনের ১৭ বছর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রতিবেশী বলেন, ‘ওনার ছেলের গ্রাম পুলিশের চাকরি কীভাবে হবে? এটা করতে গেলে তো অন্তত এইট (অষ্টম শ্রেণি) পাস করতে হবে। ওনার ছেলে তো পড়াশোনা জানে না। তা ছাড়া গ্রাম পুলিশের চাকরির জন্য একসঙ্গে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা কোথা থেকে পেলেন? আমাদের মনে হচ্ছে, এটা কোনো ষড়যন্ত্র হতে পারে।’

অভিযোগকারিণীর বক্তব্য

রেহেনা বেগম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছেলে লেখাপড়া তেমন একটা করে নাই। আমি ছয় মাস আগে ইউএনও স্যারকে গিয়ে বলছি যে স্যার আমরা গরিব মানুষ, একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেন। তখন উনি চৌকিদারের চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে ৫ লাখ চাইলেও পরে ৩ লাখের কথা বলেন। পরে আমি আমার মায়ের জমি বেইচা ১ লাখ আর আমরা কিছু দিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। উনি ট্রান্সফার হবেন শুনে আমি ওখানে গেছি।’

রেহেনা বেগম আরও বলেন, ‘আমি যে ডিসি অফিসে অভিযোগ দিয়েছি, এটার বিষয়ে মঙ্গলবার আমাকে ডিসি অফিসে ডেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা তদন্তের জন্য জেরা করেছে। আমি ওই দিন থেকে বাড়িতে যেতে পারছি না। ওখানে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করাচ্ছে। আবার সোমবার আমার ছোট ছেলেকে এবং আমি যার সাথে পেজের জন্য ড্যান্স করি ওই ছেলেকে তুলে নিয়ে গেছে। পরে আবার তাদের ছেড়ে দিছে। আমাকে নাকি ভ্রাম্যমাণ আদালতে দিবে, এ জন্য ভয়ে বাড়িতে যেতে পারছি না।’

ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে নারী কথা বলার আগে ফেসবুক লাইভ করতে পারে, সে কি কোনো প্রমাণ না রেখেই আমাকে টাকা দিয়ে চলে গেল? তিনি একজন টিকটকার। তাঁকে দিয়ে এর আগেও নাকি অনেককে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছিল। কোনো ষড়যন্ত্রকারী হয়তো তাঁকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একেবারে নিম্ন পন্থাটা অবলম্বন করেছে।’

যোগাযোগ করলে জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ওই নারীর দেওয়া অভিযোগের তদন্ত করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।