শেখ হাসিনার দ্বিতীয় নির্বাসন: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ও প্রশ্ন
শেখ হাসিনার দ্বিতীয় নির্বাসন: ২০২৪ সালের পালানোর ঘটনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ছাত্র-জনতার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। সেদিন দুপুর ১২টার পর থেকে টেলিভিশনের পর্দায় ভাসতে থাকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ভাষণ দেওয়ার খবর। বিকেল চারটার দিকে তিনি মাইক্রোফোনের সামনে এসে ঘোষণা দেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে কাজ পরিচালনা করব। ধৈর্য ধরেন, সময় দেন।'

ভারতে অবতরণ ও প্রথম প্রতিক্রিয়া

পরদিন ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় খবর ছাপা হয় যে শেখ হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি নয়াদিল্লির কাছে গাজিয়াবাদে সেনাবাহিনীর হিন্দন বিমানঘাঁটিতে স্থানীয় সময় ৫টা ৩৬ মিনিটে অবতরণ করে। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সংবাদে বলা হয়, 'কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।' সূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ, হাসিনা, বাতিঘর।

হাসিনার বর্তমান অবস্থান ও ধোঁয়াশা

১৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি এখন কোথায় কীভাবে আছেন, এ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। মাঝেমধ্যে তার অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোনা যায়, তবে এর কতটা সত্য আর কতটা এআই দিয়ে বানানো, তা বোঝা মুশকিল। তিনি নাকি যেকোনো সময় দেশে ঢুকে পড়তে পারেন। এখানে প্রশ্ন হলো, দেশে ঢুকে পড়তে এত অস্থির হলে তিনি দেশ ছেড়ে গেলেন কেন?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছিল, 'নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।' কথা যেন কেমন কেমন। হাসিনার হাতে ছিল রাষ্ট্রের সর্বময় নিয়ন্ত্রণ—পুলিশ, র্যাব, এসএসএফ, সামরিক বাহিনী সবই তার নিয়ন্ত্রণে। আরও ছিল তার হাজার হাজার সমর্থক, যাদের লাঠিসোঁটা আর আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হতে দেখা গেছে। এসব ছবি কিছু কিছু ছাপা হয়েছে পত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে। তার ও তার সমর্থকদের দাবি, তার নাকি পাহাড়সম জনপ্রিয়তা। এ সত্ত্বেও তিনি এ দেশে নিজেকে নিরাপদ মনে করলেন না! তার প্রতি সহানুভূতি জানাতে হাজার পাঁচেক লোকও গণভবনের সামনে হাজির হলো না! প্রাণ বাঁচাতে ভারতে চলে গেলেন!

নির্বাসনের প্রশ্ন: স্বেচ্ছায় না বাধ্য হয়ে?

হাসিনা এখন ভারতে। সম্ভবত নয়াদিল্লিতে কঠোর পাহারা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে আছেন। একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে—তিনি কি নির্বাসনে? তাকে কি জোর করে দেশছাড়া করা হয়েছে? নাকি তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন? এ নিয়ে সন্দেহ আছে। কেননা এর আগেও তিনি নির্বাসনে গেছেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও একদলীয় বাকশাল সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানে ছিলেন প্রায় ছয় বছর। তিনি প্রায়ই বলার চেষ্টা করেছেন, ওই সময় তাকে দেশে আসতে দেওয়া হয়নি। তার এ কথা তার দলের লোকেরাও বিশ্বাস করেন। কিন্তু আসলেই কি তাই?

বাকশাল চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবার নিহত হওয়ার সময় হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা ছিলেন ব্রাসেলসে। সেখান থেকে তিনি আসেন জার্মানির বন শহরে। বাংলাদেশের অনেক লোক ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। শেখ হাসিনা তখনই ফিরবেন, যখন তিনি নিজের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন। তার মানে, এখনকার ক্ষমতার সমীকরণটি তখন বদলে যাবে। প্রশ্ন হলো, এটি হতে কত দিন, কত বছর লাগবে?

পাসপোর্ট ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের রহস্য

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে জাসদের কয়েকশ কর্মী সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। তাদের আবেদন গ্রাহ্য হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই পরে দেশে ফিরে আসেন, অনেকেই থেকে যান। হাসিনা কেন জার্মানি কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেননি, কেন ভারতে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলেন, এ নিয়ে রহস্য থেকেই গেছে। আসলেই কি হাসিনা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন, নাকি ছিলেন দীর্ঘমেয়াদি ভিসায়, এটি জানা দরকার। রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে হলে নিজ দেশের পাসপোর্ট সারেন্ডার করতে হয়। তিনি কি সেটি করেছিলেন? করেননি। দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন হাসিনা ও তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার আবেদনক্রমে তাদের পাসপোর্ট নবায়ন করেছিল। ভারতীয় মুদ্রায় ৩১ টাকা ১০ পয়সা ফি দিয়ে হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৮ এপ্রিলে পাওয়া তার পাসপোর্ট (নম্বর বি-০৯৬২৩১) নবায়ন করেছেন ১৯৭৯ সালের ২৬ নভেম্বর। কিন্তু তার পাসপোর্টে কোনো ভারতীয় ভিসা ছিল না। তিনি ইউরোপ কিংবা ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো চেষ্টা বা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। কখনো শুনিনি, তাকে বন কিংবা দিল্লি বিমানবন্দরে বিমানে উঠতে বাধা দেওয়া হয়েছে, অথবা বিমানে ওঠার পর ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে তাকে ঢুকতে না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

স্বেচ্ছানির্বাসনের প্রমাণ

শেখ হাসিনা ছিলেন স্বেচ্ছানির্বাসনে। এক বিদেশি সাংবাদিক বলেছিলেন, দেশে ফিরতে সরকারিভাবে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তিনি নিজেই ফিরছেন না। বলেছিলেন, 'কী হবে দেশে গিয়ে? (বিচিত্রা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১)' ১৯৮১ সালের মে মাসে দেশে ফিরে তিনি বলে বেড়াতেন, তাকে সরকার দেশে আসতে দিচ্ছিল না। তিনি যে স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন, এ তথ্য তিনি গোপন করেছিলেন। এটা ছিল তার রাজনীতিরই অংশ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাসনে যান। তিনি পদত্যাগ করেছেন নাকি করেননি, তাকে কি জোর করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, নাকি তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন, এটা কি একটা আপসের (নেগোশিয়েটেড) প্রস্থান, নাকি প্রাণভয়ে পালিয়েছেন—এসব নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন।

মৃত্যুদণ্ডের রায় ও আইনি প্রক্রিয়া

শেখ হাসিনাসহ অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং মামলা সচল রয়েছে। একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বিচারটা যেভাবে তড়িঘড়ি করে করা হয়েছে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কি তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এভাবে রায় দেওয়া হয়েছে, নাকি আপাতত তাকে ঠেকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছে।

বিদেশে 'পলাতক' মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি দেশে ফিরে এসে আদালতে হাজির হবেন এবং ফাঁসির দড়ি গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বেন, এটা কষ্টকল্পনা মনে হয়। এ ধরনের অভিযুক্তরা বরং গোপনে একটা রফা করে দেশে ফিরে আসে এবং 'আইনি প্রক্রিয়ায়' খালাস পেয়ে যায়। হাসিনার ব্যাপারে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তটা যে কী, বুঝতে পারছি না। তা ছাড়া তিনি দেশে ফিরে আসতে চান কি না, সেটিও একটি প্রশ্ন।

পাসপোর্ট বাতিল ও ফেরার পথ

দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার লাল পাসপোর্ট পরবর্তী ইউনূস সরকার বাতিল করে দেয়। এই মুহূর্তে তার কাছে বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। ফলে দেশে ফিরতে হলে তার ট্রাভেল পাস লাগবে। তিনি ট্রাভেল পাস চাইলে সেটি দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের। এটি নিতে হবে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে। সরকার ট্রাভেল পাস দিলে দেশে আসতে পারবেন তিনি। যেহেতু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে, তাই ট্রাভেল পাস পেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই তিনি গ্রেপ্তার হবেন। এটা হলো আইনের কথা।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট রুলস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল না করে কেন দেরিতে করেছেন, সেই ব্যাপারে একটি 'কন্ডোলেশন অ্যাপ্লিকেশন' দিয়ে তিনি আপিল করতে পারবেন। নিরাপত্তার কারণে তিনি বিদেশে আছেন, আসতে পারেননি, আপিল দেরিতে করার কারণ হিসেবে এসব গ্রাউন্ড যুক্তিযুক্ত হবে। আদালত আপিল শোনার পরে প্রথমেই তো শেখ হাসিনার আইনজীবীরা 'স্টে' চাইবেন। 'স্টে' হবে। তারপর মূল আপিলের শুনানি হবে। শেখ হাসিনা আপিল করলে মৃত্যুদণ্ড 'স্টে' বা স্থগিত হয়ে যাবে।

উপসংহার: রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার দাবি, হুমকি, মাতম সবই চলছে। কিন্তু তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা পরিষ্কার নয়। বোঝা যায় এ নিয়ে বেশ কিছুদিন রাজনীতি হবে। শেখ হাসিনা তখনই ফিরবেন, যখন তিনি নিজের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন। তার মানে, এখনকার ক্ষমতার সমীকরণটি তখন বদলে যাবে। প্রশ্ন হলো, এটি হতে কত দিন, কত বছর লাগবে?