‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য ধ্বংস: বীর পুলিশ কর্মকর্তাদের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা
‘দীপ্ত শপথ’ ধ্বংস: বীর পুলিশের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিম ও সালাউদ্দিনের স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর পর থেকে সেখানে আর কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই, এবং কেউ সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যাচ্ছে না।

ভাস্কর্যের পটভূমি ও তাৎপর্য

ভাস্কর মৃণাল হক ২০১৮ সালে ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন। এটি হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিনের স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয়। প্রতিবছর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের হাইকমিশনাররা এখানে এসে তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতেন।

হোলি আর্টিজান হামলায় জঙ্গিরা ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ জন নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ সদস্যদের বীরোচিত আত্মোৎসর্গ ও গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত শরীরের মধ্য দিয়ে দেশ-বিদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি জোরালো হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভাস্কর্য ধ্বংস ও স্মৃতি মুছে ফেলা

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে রবিউলের নামও মুছে ফেলা হয়েছে। শহীদ রবিউলের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস বলেন, ‘এগুলো ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। এগুলো নিছক কোনো নামফলক বা ভাস্কর্য নয়, এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে ইতিহাস জানার আগ্রহ তৈরির স্মারক।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শামসুজ্জামান শামস প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের পর থেকে সব সময় আমাকে সগর্বে বলতে হয়েছে রবিউল আমাদের ভাই। আমাদের ভাইকে নানাভাবে সম্মান জানানো হয়েছিল। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভাস্কর্যটি যেমন ভেঙে ফেলা হয়েছে, ঠিক তেমনি ডিবির প্রধান ফটক থেকে রবিউলের নামটিও মুছে ফেলা হয়েছে।’

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগ

শামসুজ্জামান শামস বলেন, ‘ডিবি কার্যালয়ের মূল ফটকে রবিউলের নাম কিংবা গুলশান থানার সামনের ভাস্কর্য—এগুলো ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে ইতিহাস জানার আগ্রহ তৈরির স্মারক, যা তাঁদের সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার শক্তি জোগায়। তবে কি সেই ইতিহাসকেই মুছে দিতে চাচ্ছে কেউ?’

তিনি আরও বলেন, ‘রবিউলের ছোট ভাই হিসেবে আমি অবশ্য পুরোপুরি আশাহত নই। পুলিশ বাহিনীর অনেকেই এখনো নিয়মিত খোঁজখবর নেন। অনেকেই রবিউল ভাইয়ের মতোই আগলে রাখেন আমাদের পরিবারটিকে, সংকটে নির্দ্বিধায় পাশে দাঁড়ান। পাশাপাশি বিভিন্ন দল ও মতের মানুষ এবং সাধারণ জনগণের ভালোবাসায় আমরা যেকোনো সংকট অনায়াসে মোকাবিলা করি।’

শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগ

২০২৬ সালের ১ জুলাই বিকেলে স্মৃতিস্তম্ভবিহীন গুলশান থানার সামনে, পূর্বের ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যের স্থানে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন একদল শিক্ষার্থী। এ ছাড়া একই দিনে রবিউলের নিজ গ্রামে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্কুল ‘ব্লুমস কাটিগ্রাম’-এ আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। সেখানে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করা হয়। রবিউলদের এভাবেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত।

সরকার ও পুলিশের প্রতি প্রত্যাশা

শামসুজ্জামান শামস বলেন, ‘সরকার ও পুলিশ বাহিনীর কাছে আমাদের একটাই প্রত্যাশা, শহীদ রবিউল ও সালাউদ্দিন এবং স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত অকুতোভয় পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানার সুযোগ করে দিন। রবিউলদের শুধু তাঁদের নিজের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে না দিয়ে, দেশ ও রাষ্ট্রের সম্পদ করে রাখুন। তাঁরা বেঁচে থাকুক আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে।’