জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নারী সদস্যদের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) মনিরুল হক চৌধুরীর একটি বক্তব্যকে ঘিরে ব্যাপক হইচই ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পরে বিরোধী দলের আপত্তির মুখে ওই বক্তব্য সংসদের রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত
রোববার (২৫ মে) জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরী তাঁর বক্তব্যের এক পর্যায়ে ২০০১ সালের একটি দাওয়াত অনুষ্ঠানে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। ওই অনুষ্ঠানে বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
কিছুটা হাস্যরস করে মনিরুল হক বলেন, ‘আমি বউ নিয়ে যাইনি, কয়েকজন যায়নি। কিন্তু তাহের ভাই (সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের) বউ নিয়ে গেছেন। ঢুকার পর দেখি, একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বলি তাহের ভাই ভাবি কই? উনি বলেন, “এই যে!” তখন বলি, “আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই, এটা কেমনে বুঝবো?”’ এ সময় সংসদ সদস্যদের অনেকেই উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন।
নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য
এ পর্যায়ে সংসদের নারী সদস্যদের নিয়ে কথা বলেন মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবে, ভবিষ্যৎ আছে, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা?’
বিএনপির নারী সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের নারী সদস্যদের দিকে হাত দেখিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আপনারা এদিকে দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে দেখলে কী আছে বুঝবো না, এটা ঠিক না।’
প্রতিবাদ ও উত্তেজনা
এই বক্তব্যে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা উচিত না।’
ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলের সদস্যদের বারবার বসার আহ্বান জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, তিনি কাউকে ছোট করতে চাননি। যদি কেউ ছোট হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি ক্ষমা চাইছেন।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল মনিরুল হক চৌধুরীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করা হলো।’ তখন বিরোধীদলীয় সদস্যরা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানান।
ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আপনারা-আমরা সকলেই জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য। আমরা যদি আমাদের শালীনতা, আমাদের সম্মান-মর্যাদা না রাখি, জাতির কাছে, যারা আমাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন, তাঁদের কাছে লজ্জিত হব। এই মহান সংসদ গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনার চারণক্ষেত্র, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কেউ কোনো কথা ভবিষ্যতে বলবেন না।’
এরপর আবার বক্তব্য শুরু করেন বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে নিয়ে বক্তব্য দিলে সংসদে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে সরকারি দলের সদস্যরাও হইচই করতে থাকেন। একপর্যায়ে আসরের নামাজের বিরতি ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার।
বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যদের বক্তব্য সংসদীয় রীতিনীতি, সাংবিধানিক অধিকার, সবকিছুর সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সেটা সংসদে এনে যেভাবে কটাক্ষ করা হলো, তা অমার্জনীয় অপরাধ।
মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যকে হীন ও বর্ণবাদী আচরণ আখ্যা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ওই সংসদ সদস্য বিরোধী দলের নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, তা তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে হরণ, এটাও অমার্জনীয় অপরাধ। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় ও পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে।
এরপর ডেপুটি স্পিকার বলেন, ওই সদস্যের বক্তব্যে সংসদের রীতিনীতির বাইরে যে অংশ আছে, সেটা এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।



