বরিশাল নগরীর অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদারের অণ্ডকোষ চেপে ধরে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু যুবদলের কেউ নন বলে দাবি করেছে যুবদল।
সংবাদ সম্মেলনে যুবদলের অবস্থান
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা-সমালোচনার মুখে রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে বরিশাল দক্ষিণ জেলা ও মহানগর যুবদলের নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি করেন। বরিশাল প্রেসক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘটনায় জড়িত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন রেজা খান, সাধারণ সম্পাদক তসলিম উদ্দিন এবং মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান মামুন উপস্থিত ছিলেন।
যুবদল নেতার বক্তব্য
এ সময় মাসুদ হাসান মামুন বলেন, ‘অগ্রণী হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে ঢুকে এমডি আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর করে অণ্ডকোষ চেপে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় জড়িত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামের এক ব্যক্তিকে বিভিন্ন মিডিয়ায় যুবদল নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক, মোস্তাফিজুর রহমান লিটু আগে যুবদলের বরিশাল মহানগরের কোনও কমিটির কোনও পদে ছিল না এবং বর্তমানেও বরিশাল মহানগর ও জেলা যুবদলের কোনও পদে নেই।’
তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও কিছু লেখার আগে অবশ্যই বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। তা না হলে বড় একটি সংগঠন এবং এর সঙ্গে যারা জড়িতকে তাদের সম্মানহানি হয়। এ কারণে রাজনৈতিক সংগঠনের নাম জড়ানোর আগে তা নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল। তারপরও আমরা দৃঢ়কণ্ঠে বলতে চাই, ওই ব্যক্তি যুবদলের কোনও অংশের সঙ্গে জড়িত নয়। এমনকি আমাদের দলের কর্মীও নয়। ওই ব্যক্তি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করছি আমরা।’
গ্রেফতার ও ঘটনার বিবরণ
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার ভিডিও ভাইরালের পর রবিবার (০৫ জুলাই) দুপুরে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগী আবুল কালামকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা নগরীর কাটপট্টি এলাকার বাসিন্দা। লিটুর ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু বরিশাল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এমডি আব্দুল আজিজ তার কক্ষে বসে চা পান করছিলেন এবং দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় চার জন যুবক কক্ষে প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে কালো জামা পরা মোস্তাফিজুর রহমান সবার শেষে কক্ষে ঢুকে প্রথমে সেখানে উপস্থিত অন্যদের বাইরে বের করে দেন। এরপর তিনি আব্দুল আজিজের কাছে গিয়ে হঠাৎ তাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় জাপটে ধরেন। এতে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে আব্দুল আজিজ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে উপস্থিত আরেক ব্যক্তি তার পা টেনে ধরেন। পরে তিনি দাঁড়িয়ে গেলে মোস্তাফিজুর রহমান তাকে একাধিকবার চড় মারেন। এরপর দুজনের মধ্যে কথোপকথন হলেও তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মারধরের একপর্যায়ে মোস্তাফিজুর রহমান আব্দুল আজিজের অণ্ডকোষ চেপে ধরেন। সেইসঙ্গে দুটি সাদা চেক ও দুটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেওয়া হয়। পরে আব্দুল আজিজকে ওই চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়।
ঘটনার সময় আব্দুল আজিজ ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে একজনকে ডাকতে শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাকে অল্প সময়ের জন্য আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া হয়। ভিডিওতে স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেক ও স্ট্যাম্প গ্রহণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করতে দেখা যায়। ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় মোস্তাফিজুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘হাসেন... হাসেন।’
ভুক্তভোগীর বক্তব্য ও মামলা
আব্দুল আজিজ জানান, একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিন বছর আগে বিনিয়োগের বিপরীতে তার মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে সমপরিমাণ জমি তাকে হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়। ওই সময় কোনও পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেন মোস্তাফিজুর রহমান।
আব্দুল আজিজের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে মোস্তাফিজুর রহমান এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে সব ধরনের হিসাব আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ওই অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। এর পরিপ্রিক্ষেতে গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোস্তাফিজুর তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে অফিসে ঢুকে তাকে (আবদুল আজিজ) মারধর করেন এবং জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেক থেকে টাকা তুলতে পারেননি মোস্তাফিজুর রহমান। এই ঘটনায় তিনি গত বৃহস্পতিবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন। বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহ মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।



