চুয়াডাঙ্গায় জামায়াত কর্মী হত্যা মামলায় বিএনপি নেতাসহ ১৩ জন আসামি, গ্রেপ্তার তিন
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংঘর্ষে জামায়াতের এক কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের আটজনসহ মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে তিনজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। নিহত হাফিজুর রহমানের বড় ভাই আমির হোসেন বাদী হয়ে গত রোববার রাতে জীবননগর থানায় এই মামলাটি করেন।
মামলার বিবরণ ও আসামিদের তালিকা
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, জীবননগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও সীমান্ত ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ময়েন উদ্দীনকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মেহেদী হাসান, তাঁর তিন ভাই ইমরান হোসেন, মো. বাপ্পা ও মো. তৌফিক এবং তাঁদের বাবা জসিম উদ্দিন ছাড়াও মো. তুষার ও শাহীন রেজাকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের সবার বাড়ি উপজেলার হাসাদহ এলাকায়। গত শনিবার রাতে এই এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সি) সোলায়মান শেখ মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, এজাহারনামীয় মেহেদী হাসান ও তাঁর বাবা জসিম উদ্দিনসহ গ্রেপ্তার তিনজন বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের তরফ থেকে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া ও দাবি
মামলায় উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ময়েন উদ্দীনকে হুকুমের আসামি করায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান। তিনি দাবি করেন, হাসাদহ বাজারে সংঘর্ষের অন্তত দেড় ঘণ্টা পর ময়েন উদ্দীন ঘটনাস্থলে যান এবং দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করেন।
আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘জামায়াত ইনটেনশনালি ময়েন উদ্দীনকে আসামি করেছে। সংঘর্ষে আমাদের দলীয় লোকজনও গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত নেতাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে।’ তাঁর মতে, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জামায়াত ইচ্ছাকৃতভাবে বিএনপি নেতাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা
মামলার এজাহারে বাদী আমির হোসেন উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁর ভাই মফিজুর রহমানের (ইউনিয়ন জামায়াতের আমির) সঙ্গে আসামিদের দীর্ঘদিন ধরে শত্রুতা চলে আসছে। আসামিরা প্রায়ই মফিজুর রহমানকে হত্যা-জখমের হুমকি দিতেন বলে দাবি করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বাদীর ছেলে মাহফুজুর রহমান, দুই ভাই মফিজুর রহমান ও হাফিজুর রহমান হাসাদহ বাজারে জামায়াতের কার্যালয়ে ইফতার শেষ করে বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে হাসাদহ কামিল মাদ্রাসার সামনে পৌঁছানো মাত্রই পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক হত্যার উদ্দেশ্যে আসামিরা জিআই পাইপ, লোহার রড, চায়নিজ কুড়ালসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁদের গতি রোধ করে হামলা করেন।
আসামিদের উপস্থিতি টের পেয়ে মফিজুর রহমান দৌড়ে পালানোর সময় আসামি ময়েন উদ্দীনের হুকুমে ইমরান হোসেন তাঁর হাতে থাকা চায়নিজ কুড়াল দিয়ে উপর্যুপরি কোপান। মফিজুর জীবন বাঁচাতে চিৎকার দিলে হাফিজুর ঠেকাতে গেলে মেহেদী হাসান চায়নিজ কুড়াল দিয়ে তাঁর (হাফিজুরের) বাঁ চোখের ভ্রুর ওপর কোপ মেরে গুরুতর জখম করেন। এ সময় আসামি বাপ্পা ও তৌফিক রড দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন।
বাদীর ছেলে মাহফুজুর রহমান এগিয়ে গেলে আসামি তুষার ও শাহীন রেজা লোহার রড দিয়ে পেটান। এতে তিনজনই গুরুতর জখম হন। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি লোকজন ছুটে এসে আহত তিনজনকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকেই যশোরে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় নেওয়ার পথে হাফিজুর রহমান মারা যান। বর্তমানে মফিজুর রহমান ও মাহফুজুর রহমান ঢাকার পৃথক দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা শহরে বিক্ষোভ ও মিছিল
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে চুয়াডাঙ্গা শহরে সোমবার বিকেলে বিক্ষোভ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। শহীদ আবুল কাশেম সড়কে স্থানীয়রা জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমানের হত্যার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার দাবি করেন। এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ কামনা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনা নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পুলিশ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে। বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



