গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ: সংকট ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে জাতির প্রতীক্ষা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই এক জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের যুগে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি-প্রভৃতি ক্ষেত্রে নানামুখী অস্থিরতার আবহ পরিলক্ষিত হইতে থাকে। জনমনে উদ্বেগ, শঙ্কা ও প্রত্যাশার এক অদ্ভুত সহাবস্থান লক্ষ করা গিয়াছে। ফলে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং নীতিনির্ধারণী স্তরে পরিবর্তনের সহিত নানাবিধ চ্যালেঞ্জকে অস্বাভাবিক বলিয়া গণ্য করা যায় না।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ
এই ধরনের টালমাটাল পরিবেশে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বাজারব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আস্থার পরিবেশ ফিরাইয়া আনিবার প্রশ্নে কোনো স্বল্পকালীন সমাধান আশা করাটা যায় না। কারণ, গণআন্দোলনের পরের সময়গুলিতে জাতিকে সর্বদাই কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়া যাইতে হয়। সেইরূপ অবস্থায় নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের ধৈর্য-এই তিনের সমন্বয়েই কেবল সংকটের উত্তরণ সম্ভব। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল বলিয়া প্রতীয়মান হউক না কেন, নিরাশ হইবার অবকাশ নাই।
নবগঠিত সরকারের দায়িত্ব ও প্রত্যাশা
গণঅভ্যুত্থানের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নূতন সরকার গঠন করিয়াছে এবং সরকারের পক্ষ হইতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নীতি-সংস্কার এবং রাজনৈতিক সংলাপের যেই ইঙ্গিত প্রদান করা হইয়াছে, তাহা সম্পূর্ণ উপেক্ষণীয় নহে। নবগঠিত সরকারে অনেক দূরদর্শী নেতৃত্ব রহিয়াছেন, যাহাদের দিকনির্দেশনায় পরিস্থিতি ক্রমশ উন্নতির দিকে যাইবে বলিয়া অনেকে আশা করিতেছেন। অবশ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার উচ্চারণ করিলেই দায়িত্ব শেষ হইয়া যায় না, বরং উহার কার্যকর প্রয়োগের মধ্য দিয়াই নেতৃত্বের সততা ও সক্ষমতা প্রমাণিত হয়। এই পরীক্ষায় সরকার কতটা সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হইতে পারে, তাহাই এখন জাতির প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সংসদীয় কার্যক্রম ও জাতীয় ঐকমত্য গঠনের গুরুত্ব
সুতরাং, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এই ক্ষণে সকলকে ধৈর্যশীল হইতে হইবে। অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসিবার কথা রহিয়াছে। সংসদীয় কার্যক্রম সচল হইলে নীতি ও আইন প্রণয়নের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সুসংহত হইবে। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নহে, ইহা জাতীয় ঐকমত্য গঠনেরও প্রধান মঞ্চ। সেইখানে যদি গঠনমূলক বিতর্ক, যুক্তিনির্ভর সমালোচনা এবং সমন্বিত সিদ্ধান্তের চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহা হইলে বর্তমান অস্থিরতা অনেকাংশে প্রশমিত হইতে পারে।
সরকার, বিরোধী শক্তি ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
অবশ্য এই স্বস্তি যদি 'সাময়িক' হিসাবে অতীতের পুনরাবৃত্তি করে, তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই থাকিবে না। এই জন্য সরকারকে যেমন দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে হইবে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম প্রভৃতি সকল পক্ষকেই সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হইবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণআন্দোলন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায় না, বরং উহা রাষ্ট্রচিন্তা, শাসনদর্শন ও নাগরিক প্রত্যাশার ভিত্তিকেও আলোড়িত করিয়া তোলে।
রূপান্তরের সন্ধিক্ষণ: সম্ভাবনা ও সংকটের সহাবস্থান
অতএব, বর্তমান সময়কে কেবল অস্থিরতার দৃষ্টিতে বিচার করিলে চলিবে না, ইহা একান্তই রূপান্তরের সন্ধিক্ষণ, যাহার মধ্যে সম্ভাবনা ও সংকট-উভয়ই সমভাবে বিদ্যমান। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার পুনর্গঠনই এই মুহূর্তে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। বর্তমান সময়কে যদি দায়িত্ববোধ ও দূরদৃষ্টির সহিত ধারণ করা যায়, তাহা হইলে ইহাই হইতে পারে একটি সুসংহত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণের সূচনা।
জাতির প্রত্যাশা ও ইতিহাসের পরীক্ষা
মনে রাখিতে হইবে, সংকটের গভীরতাই নেতৃত্বের দৃঢ়তা যাচাইয়ের মাপকাঠি আর তাই জাতির প্রত্যাশাও কম নহে। তাহারা আজ তাকাইয়া আছে রাষ্ট্রের দিকে, যেইখানে কথার চাইতে কাজ অধিক হইবে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটিবে এবং বিভাজনের পরিবর্তে দৃশ্যমান হইবে ঐক্যের রাজনীতি। সময়ের এই কঠিন পরীক্ষায় সরকার সাফল্য অর্জন করিলে ইতিহাস ইহাকে পুনর্জাগরণের অধ্যায় বলিয়া অভিহিত করিবে নিঃসন্দেহে।
ধৈর্য ও আস্থার আহ্বান
গণঅভুত্থানের পর যেইরূপ অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা রাতারাতি কাটিয়া যাইবার নহে। পরিস্থিতি ক্রমশ উন্নতির দিকে যাইতেছে এবং যাইবে। অগ্নিভর্তি বৃহৎ কড়াইকে ক্ষুদ্র ঢাকনা দিয়া ঢাকিয়া কতটুকুই-বা অগ্নি-উত্তাপ প্রশমন করা যায়? সেই তুলনায় বরং কিছুটা হইলেও স্বস্তির দেখা মিলিয়াছে। পরিস্থিতি রাতারাতি বদলাইয়া যাইবে না। সুতরাং, ধৈর্য এবং আস্থা রাখিতে হইবে।
