বিএনপি এমপির বিতর্কিত বক্তব্য: দলের নেতাদের স্ত্রী জামায়াতকে ভোট দেওয়ায় তালাকের পরামর্শ
বিএনপি এমপির বিতর্ক: জামায়াতকে ভোট দেওয়ায় স্ত্রী তালাকের পরামর্শ

বিএনপি এমপির বিতর্কিত বক্তব্যে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি

কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি দাবি করেছেন যে, তার আসনে কিছু বিএনপি নেতার স্ত্রী জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন এবং এ কারণে ওই নেতাদের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে এই বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জাগিয়েছে।

লালমাই উপজেলায় ইফতার মাহফিলে দেওয়া বক্তব্য

মঙ্গলবার লালমাই উপজেলা পরিষদ মাঠে বিএনপি আয়োজিত একটি ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এমপি মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া। লালমাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মাসুদ করিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে তিনি দলের কিছু নেতাকর্মীর উদ্দেশ্যে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। ভাইরাল হওয়া প্রায় দুই মিনিটের বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের কাছে আমি ঋণী, আমার কিছু কিছু মুনাফেকের কাছেও আমি ঋণী আছি। এরা ভোটের দিন কি করেছে জানেননি, এরা কিন্তু আমার দলের বড় বড় নেতা। এরা জামাতকে অর্থ দিয়েছে, অর্থ। নিজের বউ জামাতরে ভোট দিছে। বেশরম, এখন মুখ দেখাইতে আইছে। তুই কচু গাছের লগে ফাঁসি দিয়া মরতি হারচ্ছা? তুই বেডি (স্ত্রী) এইডার লগে ঘর করছ কেমনে। কয়-আই কিত্তাম, হেতি কথা দিয়া লাইছে। তয়, হেতিরে (স্ত্রী) তালাক দিয়া দে।’

বক্তব্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দিক

এমপি মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া তার বক্তব্যে আরও যোগ করেন, ‘যে জামাইকে সম্মান করে না, সে পরিবারকে সম্মান করে না। আমি এর আগে বলছি না, নফল এবাদত করতে অইলেও তো মহিলাদের জামাইর অনুমতি নিতে হয়। আর তুমি ভোট দিয়া লাইছ ৫০০ টেহার (টাকা) বিনিময়ে।’ তিনি অভিযোগ করেন যে, ‘আমাগো নেতারা জামাতরে টাকা দিছে, হেতাগো (তাদের) এসিআর আমার কাছে আইগেছে। এখন উনারা কি করে জানেননি, ঢাকা যাই বই থাহে, আমার লগে সেলফি তোলে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত বলে সেলফি দিয়া অই যাইব!’

তিনি আরও বলেন, ‘আই এমনে ধরি কই (অঙ্গভঙ্গি করে), কিয়ারে চিটিং তুই ভোটের দিন কোনাই আছিলি, অহন কইত্তো আইছত? (ভোটের দিন কোথায় ছিলি, এখন কোত্থেকে এসেছিস)। হেগুন এলাকায় আই আঁর নামে (ওরা এলাকায় এসে আমার নামে) বদনাম রটায়-নেতা খারাপ ব্যবহার করে। এরকম খারাপ ব্যবহার আমার আজীবন চলবে।’ এমপি মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া দাবি করেন, ‘আপনাদের কারও সাথে খারাপ ব্যবহার কইচ্ছিনি, তাইলে কার লগে খারাপ ব্যবহার করি, ওই হেতার লগে। যেতে আঁর কেন্দ্র বেচিয়ালাইছে (যে আমার কেন্দ্র বিক্রি করে দিয়েছে)। .... আমাদের নাকি প্রার্থী ঠিক নাই, প্রার্থীর দরকার কী ধানের শীষ থাকলেই তো অইল। এই বদমাইশ, এগুলোরে চিহ্নিত করছি আরও করব।’

বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও এমপি মো. মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও লালমাই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুফ আলী মীর পিন্টু বলেন, ‘আমাদের (বিএনপি) নেতাকর্মীদের অনেকের স্ত্রী জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, স্বামী দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীকে। কেউ কেই আবার ৫০০ টাকায়ও ভোট বিক্রি করেছেন। তাই, আমাদের নেতা (এমপি মোবাশ্বের) দলের কিছু নেতাকর্মীর প্রতি অভিমান করে এমন বক্তব্য দিয়েছেন।’

এর আগের বিতর্কিত বক্তব্য

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার রাত ১০টায় এমপি মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া লালমাই উপজেলার বাগমারা বাজারের জিরো পয়েন্টে নির্বাচন নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরেকটি বক্তব্য রাখেন। তার ওই বক্তব্যের ১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল, যা তখনও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

এমপি মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার এই সর্বশেষ বক্তব্য বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সামাজিক মাধ্যমে এই ভিডিওর ব্যাপক প্রচার রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করছে, যা দলীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।